যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম অধিকার সংস্থা 'কেয়ার'-এর সঙ্গে সন্ত্রাসের যোগসূত্রের অভিযোগ
ইমা এলিস: ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক মুসলিম অধিকার সংস্থা কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) নিজেদের পরিচয় দেয় একটি অলাভজনক নাগরিক অধিকার সংগঠন হিসেবে, যার লক্ষ্য 'ইসলাম সম্পর্কে বোঝাপড়া বৃদ্ধি, নাগরিক অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আমেরিকান মুসলমানদের ক্ষমতায়ন।' বর্তমানে প্রায় ২০টি অঙ্গরাজ্যে সংগঠনটির শাখা রয়েছে।
১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কেয়ার দাবি করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিরোধী বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ছে, জনসাধারণকে ইসলাম সম্পর্কে সচেতন করছে এবং ইসলামোফোবিয়া প্রতিহত করছে। তবে সংগঠনের তিন প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধেই সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় ৩০ বছরের কর্মকালে কেয়ার নিজেদের মুসলমানদের অধিকাররক্ষাকারী সংস্থা হিসেবে তুলে ধরলেও, সংগঠনটি বারবার সমালোচিত হয়েছে উগ্রপন্থী মতাদর্শ ও সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অভিযোগে। ইহুদি সংগঠন অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ (এডিএল) জানিয়েছে, 'কেয়ারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রকাশ্যে ইহুদিবিদ্বেষী ও ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন।'
সাম্প্রতিক ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের সময় কেয়ার বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ফিলিস্তিনপন্থী এবং ইসরায়েলবিরোধী প্রচারণায় সক্রিয় থাকার কারণে।
নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনের আগমুহূর্তে মুসলিম-আমেরিকান কর্মী লিন্ডা সারসুর দাবি করেন, কেয়ার ছিল প্রার্থী জোহরান মামদানির বিজয়ী প্রচারণার প্রধান সমর্থক। ওয়াশিংটন ফ্রি বিকন জানিয়েছে, মামদানির প্রচারণায় কেয়ার-সম্পর্কিত একটি পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) থেকে ১ লাখ ডলার অনুদান গেছে।
অনেক ইহুদি ও প্রো-ইসরায়েল সংগঠন মামদানির বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষী অবস্থানের অভিযোগ তুলেছে যার মধ্যে রয়েছে 'ইন্তিফাদা বিশ্বায়নের' আহ্বান সমর্থন করা এবং ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া।
কেয়ার কীভাবে কাজ করে
সংগঠনটি রাজ্যভিত্তিকভাবে পরিচালিত হয়; বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ৩২টি অধ্যায় রয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, নাগরিক অধিকার, গণমাধ্যম, ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধ এবং তরুণদের জন্য কর্মসূচি তাদের প্রধান উদ্যোগ।
কেয়ারের আইনি কার্যক্রম
কেয়ারের দাবি, তারা মুসলমান ও অন্যান্যদের আইনি সহায়তা দেয় যারা ধর্মীয় বৈষম্য, অপমান বা ঘৃণাজনিত অপরাধের শিকার।
এই বছর মিশিগানে কেয়ার-মিশিগান শাখা একটি মুসলিম নারীর পক্ষে মামলা করে, যাকে বুকিং প্রক্রিয়ায় হিজাব খুলতে বাধ্য করা হয়েছিল।
ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কেয়ারের আইনি বিভাগ মূলত ইসরায়েলবিরোধী কর্মীদের পক্ষে আইনগত সহায়তা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কেয়ার মেটা, অ্যাপলসহ কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানি এবং মিসৌরি ও নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
কেয়ার প্রকাশ্যে মাহমুদ খলিল ও রুমেইজা ওজতুর্কের মতো অ-নাগরিক ইসরায়েলবিরোধী শিক্ষার্থীদের সমর্থন জানিয়েছে, যাদের ট্রাম্প প্রশাসন দেশ থেকে বহিষ্কার করার চেষ্টা করেছিল।
রাজনীতিতে কেয়ার
জাতীয় রাজধানীতে সদর দপ্তর হওয়ায় কেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও প্রভাব রাখে। এর রাজনৈতিক শাখা কেয়ার অ্যাকশন সরকারে লবিং কার্যক্রম পরিচালনা করে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, 'কেয়ার প্রতিনিধি দল অঙ্গরাজ্য আইনসভা ও কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়েছে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্বেগ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরেছে।'
যদিও মূল সংগঠনটি প্রার্থীদের সমর্থন করতে পারে না, কেয়ার অ্যাকশন আনুষ্ঠানিকভাবে তা করে এবং অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল পর্যায়ের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিস—দুজনেরই ইসরায়েলপন্থী অবস্থানে অসন্তুষ্টি জানিয়ে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়নি। বরং তারা মুসলিম ভোটারদের গ্রিন পার্টির জিল স্টেইনের মতো তৃতীয় পক্ষের প্রার্থীকে ভোট দিতে উৎসাহিত করে।
কেয়ারের জরিপে দেখা যায়, মুসলিম ভোটারদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জিল স্টেইনকেই বেশি পছন্দ করেছেন।
বিতর্কিত প্রতিষ্ঠাতা
কেয়ারের তিন সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওমর আহমাদ, নিহাদ আওয়াদ এবং রফিক জাবের তিনজনই ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তদন্তের মুখে পড়েছিলেন। আহমাদ ২০০৫ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন, আর আওয়াদ এখন নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে আহমাদ ফিলাডেলফিয়ায় একটি প্রো-হামাস সম্মেলন আয়োজন করেন, যেখানে হামাস-সমর্থিত সংগঠন হোলি ল্যান্ড ফাউন্ডেশন (এইচএলএফ) ও ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব প্যালেস্টাইন (আইএপি)-এর সদস্যরা অংশ নেন। সেখানে হামাসকে কীভাবে গোপনে সমর্থন দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
আওয়াদ পূর্বে আইএপি-এর জনসংযোগ পরিচালক ছিলেন এবং হামাসকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিতেন; তবে ২০০৬ সালে তিনি সেই সমর্থন প্রত্যাহার করেন। জাবের, যিনি আইএপি-এর সভাপতি ছিলেন, আত্মঘাতী হামলাকে নিন্দা করতে অস্বীকৃতি জানান।
আইএপি ও এইচএলএফ কী?
আইএপি প্রতিষ্ঠা করেন হামাসের শীর্ষ নেতা মুসা আবু মারজুক। তিনি হামাস-সম্পর্কিত দাতব্য সংস্থায় অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আদালত আইএপি ও এইচএলএফ -কে হামাসকে সহায়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ১৯৯৬ সালে জেরুজালেমে ১৭ বছর বয়সী ডেভিড বোইম হত্যাকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে।
এইচএলএফ-কে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেয়। পরে ২০০৮ সালে এর পাঁচ কর্মকর্তা হামাসের জন্য ১ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সরবরাহের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। কেয়ারকেও এই মামলায় ‘সহ-ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যদিও তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি।
কেয়ার নিয়ে বর্তমান বিতর্ক
কেয়ারের কিছু স্থানীয় নেতা বহু বছর ধরেই ইসরায়েল ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করে আসছেন। ২০২১ সালে কেয়ার সানফ্রান্সিসকো বে এরিয়া শাখার নির্বাহী পরিচালক জাহরা বিল্লু অভিযোগ করেন যে 'জায়নিস্ট সিনাগগগুলো ইসলামোফোবিয়ার পেছনে আছে।' ইহুদি সংগঠন ADL-এর প্রধান জনাথন গ্রিনব্লাট তার বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। কেয়ার তখন বিল্লুর পক্ষ নিয়ে সেই সমালোচনাকে “মানহানিকর প্রচারণা” বলে দাবি করে।
অন্যদিকে, কেয়ার-নিউ ইয়র্কের বোর্ড ভাইস প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোসাল্লাম অনলাইনে ৭ অক্টোবরের হামলাকে প্রশংসা করে বক্তব্য দেন। তিনি ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সে পাইলট হিসেবে স্থগিত হলেও কেয়ার পদে বহাল আছেন।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিহাদ আওয়াদও ৭ অক্টোবরের গণহত্যা নিয়ে মন্তব্য করে প্রশাসনের তীব্র নিন্দার মুখে পড়েন; বাইডেন প্রশাসন তার বক্তব্যকে 'ইহুদিবিদ্বেষী' বলে আখ্যা দেয়।
এরপর কী?
বিগত তিন দশকে কেয়ার তুলনামূলকভাবে কম তদন্তের মুখে পড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবার আলোচনায় এসেছে।
এই বছর আগস্টে সিনেটর টম কটন (আরকানসাস) কেয়ারকে করমুক্তির মর্যাদা বাতিলের আহ্বান জানান, হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ তুলে। কেয়ার এই অভিযোগকে “প্রমাণহীন ষড়যন্ত্র ও আইনি ভিত্তিহীন দাবি” বলে প্রত্যাখ্যান করে।
এর আগে জুনে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন কেয়ারের বিরুদ্ধে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দেন।
তিন দশক পর, কেয়ার এখন এক সঙ্কটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে। সমালোচকদের কাছে এটি সন্ত্রাসপন্থী গোষ্ঠীর আড়াল, আর অনেক আমেরিকান মুসলমানের কাছে এটি ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে এক মূল্যবান প্রতিরক্ষা সংগঠন।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
গুলির শব্দে হোয়াইট হাউস অবরুদ্ধ, সরিয়ে নেওয়া হলো সংবাদকর্মীদের
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি