যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিতে অনিশ্চয়তায় হাজারো প্রত্যাশী নাগরিক
নোমান সাবিত: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাগরিকত্ব প্রদান (ন্যাচারালাইজেশন) অনুষ্ঠান স্থগিত করার সিদ্ধান্তে সারা দেশের বহু অভিবাসী এক অস্বাভাবিক ও অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছেন যখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে ছিলেন।
সমালোচকদের মতে, এই স্থগিতাদেশ ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ 'সমষ্টিগত শাস্তি'। ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ডের এক সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার পর নাগরিকত্বের আশায় বড় ধাক্কা খেয়েছেন বহু মানুষ।
থ্যাঙ্কসগিভিংয়ে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি 'সব তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে অভিবাসন স্থায়ীভাবে স্থগিত' করবেন। পরের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ১৯টি দেশের নাগরিকদের জন্য নাগরিকত্ব প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত করে। পরে ডিসেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট তালিকা বাড়িয়ে ৩৯টি দেশে উন্নীত করেন।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অভিবাসীরা ইতিমধ্যে নাগরিকত্ব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, কিন্তু নাগরিকত্ব চূড়ান্ত করার জন্য যে শপথ অনুষ্ঠান প্রয়োজন, তা নিতে পারছেন না।
নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান আদ্রিয়ানো এসপাইয়াত বলেন, 'মানুষ ভীষণ বিভ্রান্ত ও উদ্বিগ্ন। তারা পুরো প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করেছেন, শুধু আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানটি বাকি ছিল। এখন একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে—শেষ ইনিংসে—তাদের অযোগ্য ঘোষণা করে শপথ নিতে না দেওয়া হতে পারে, এই আশঙ্কায় তারা ভুগছেন।'
নিজেও একজন ন্যাচারালাইজড নাগরিক এসপাইয়াত জানান, অনিশ্চয়তায় ভোগা মানুষের ফোনে তার দপ্তর ভরে গেছে।
তিনি বলেন, 'তারা ঝুলে আছে, এবং আমি নিশ্চিত, এতে প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তারা নিজেদের আমেরিকান মনে করলেও, বাস্তবে তারা তা নন—যতক্ষণ না শপথ নেন।'
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত প্রতি বছর প্রায় আট লাখ মানুষ নাগরিকত্ব পান, যাদের বড় অংশ মেক্সিকো, ভারত ও ফিলিপাইন থেকে আসা।
এই সপ্তাহে সিনেটের মেঝেতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ডিক ডারবিন বলেন, 'নাগরিকত্বের জন্য নির্ধারিত অনুষ্ঠান থেকে প্রার্থীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি জানি এটা সত্য, কারণ আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষরা আমার দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'যারা ইতিমধ্যে নাগরিকত্বের জন্য অনুমোদিত হয়েছেন, তাদের শপথ নেওয়া থেকে প্রশাসন থামিয়ে দিয়েছে—এতে তারা ন্যায়সঙ্গতভাবেই ক্ষুব্ধ।'
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার আগে অভিবাসীদের আরও কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, উচ্চঝুঁকির দেশগুলোর নাগরিকদের সব আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, যাতে তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাচাই ও স্ক্রিনিং নিশ্চিত করা যায়। এই বিরতি নির্ধারিত উচ্চঝুঁকির দেশগুলোর নাগরিকদের সব চলমান সুবিধা-সংক্রান্ত আবেদন পর্যালোচনার সুযোগ দেবে।
তিনি যোগ করেন, আমেরিকান জনগণের নিরাপত্তাই সবসময় প্রথম।
কিন্তু অভিবাসন অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই যুক্তির কোনো ভিত্তি নেই, কারণ বহু সম্ভাব্য নাগরিক বহু বছর, এমনকি কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন এবং প্রতিটি ধাপেই যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন।
শেভ দালাল-ধেইনি বলেন, তারা কোনো অপরাধ করেননি করলে তো নাগরিকত্বের যোগ্যই হতেন না। তারা আবেদন করেছেন, ফি দিয়েছেন, নাগরিকত্ব ও ভাষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, সব কিছু পাস করেছেন।
তিনি বলেন, তারা একেবারে শেষ ধাপে ছিলেন—যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেওয়ার মুহূর্তে। আর ঠিক তখনই তাদের পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ও যাচাইয়ের অজুহাত টেকে না। বিভিন্ন প্রশাসনের সময়ে, একাধিক সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তাদের বহুবার যাচাই করা হয়েছে।
নাগরিকত্ব প্রদান অনুষ্ঠান পুনরায় শুরু করার জন্য কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান প্রমিলা জয়পাল ইউএসসিআইএসকে একটি চিঠির নেতৃত্ব দেন, যাতে জানতে চাওয়া হয়—কতজন এই স্থগিতাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কীভাবে পুনরায় আবেদনগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং কবে নাগরিকত্ব অনুষ্ঠান আবার শুরু হবে।
নিজেও একজন অভিবাসী প্রমিলা জয়পাল বলেন, “সারা দেশ থেকে মানুষের কাছ থেকে যে অনুভূতি শুনছি, তা ভয়াবহ—‘এক মিনিট, আমি তো সব নিয়ম মেনে করেছি, প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছি, এতদিন অপেক্ষা করেছি।’ একজন মার্কিন নাগরিক হওয়া কত বড় সম্মান ও সৌভাগ্যের বিষয়, আমি জানি। আমি সেদিন কেমন অনুভব করেছিলাম, আজও মনে আছে।”
তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, 'আমার পেটে প্রজাপতির মতো লাগছিল। ভেবেছিলাম, এতটা প্রভাবিত হব না। কিন্তু আমি এমন এক ঘরে ছিলাম, যেখানে সারা পৃথিবী থেকে আসা মানুষ ছিল—এখনও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়—এত ভিন্ন পরিস্থিতি থেকে আসা মানুষ। কেউ যুদ্ধ ও ট্রমা থেকে পালিয়ে এসেছে, কেউ অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে, কেউ পরিবারে যোগ দিতে এসেছে। তারা প্রিয়জনদের সঙ্গে ছিল। অনুভূতিটা ছিল অসাধারণ ‘আমি পেরেছি, আমি পেরেছি।’ আমি হঠাৎ কেঁদে ফেলেছিলাম। আশা করিনি, কিন্তু কান্না চলে এসেছিল, কারণ সেটা ছিল এত সুন্দর, এত আনন্দের মুহূর্ত।'
দালাল-ধেইনি বলেন, শপথ নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা অনেকেই বিভিন্ন অভিবাসন মর্যাদার ধাপ পেরিয়ে এসেছেন—গ্রিনকার্ড পেতে বছর লেগেছে, তারপর নাগরিকত্বের আবেদন করেছেন।
তিনি বলেন, 'এটা পুরোপুরি আমাদের আমেরিকান মূল্যবোধের পরিপন্থী। আমরা অভিবাসীদের দেশ—আমাদের পূর্বপুরুষরাই অভিবাসী ছিলেন। আর এখন বলা হচ্ছে, তোমরা এখানে স্বাগত নও—যদিও সেটাই এই দেশের ভিত্তি।'
এমনকি যেসব দেশ এই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেই, সেখানকার মানুষরাও সামনে এগোতে ভয় পাচ্ছেন।
খবর পাওয়া গেছে, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় না থাকা কিছু দেশের নাগরিকদের নাগরিকত্ব অনুষ্ঠানের অ্যাপয়েন্টমেন্টও বাতিল করা হয়েছে। আবার, অভিবাসন আদালতে হাজিরার পর কিছু অভিবাসী গ্রেপ্তার হওয়ায় অনেকেই উপস্থিত হতে ভয় পাচ্ছেন।
জয়পাল বলেন, এখন মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘আমি কি নাগরিকত্ব অনুষ্ঠানে যাব? যদি সেখানে গিয়ে আমাকে ধরে নিয়ে যায়?’ এটা একেবারেই নজিরবিহীন, এবং এটা বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর আঘাত। তারা সবসময় বলত, তারা কাগজবিহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে 'সবচেয়ে খারাপদের’ টার্গেট করবে।'
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'এই মানুষগুলো সে রকম নয়।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি