যুক্তরাষ্ট্রে গাঁজা বৈধকরণ: তরুণ সমাজের জন্য স্বাধীনতা নাকি নতুন সংকট
ছাবেদ সাথী
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাঁজার বেচাকেনা ও সেবন এক নতুন বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। একের পর এক অঙ্গরাজ্যে বিনোদনমূলক ও চিকিৎসা উদ্দেশ্যে গাঁজা সেবনকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডোসহ বহু রাজ্যে গাঁজার দোকান এখন প্রায় সুপারশপের মতোই স্বাভাবিক দৃশ্য। আইনিভাবে বৈধতা পাওয়ায় সরকার বিপুল রাজস্ব আদায় করছে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই বৈধতার ছায়াতলে ক্রমেই যে প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠছে, তা হলো- এই সুবিধার মূল্য কি তরুণ প্রজন্মকে দিয়ে দিতে হচ্ছে?
গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, গাঁজার প্রতি তরুণদের আসক্তি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বৈধতার ফলে গাঁজা এখন আর 'নিষিদ্ধ বস্তু' নয়, বরং অনেকের কাছে এটি একটি 'নিরাপদ' বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও বিজ্ঞাপন—সবখানেই গাঁজাকে প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর ফলে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, তরুণ বয়সে গাঁজা সেবনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। মস্তিষ্কের বিকাশ ২৫ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে, আর এই সময়ে নিয়মিত গাঁজা সেবন স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বিশেষ করে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও কিছু ক্ষেত্রে সাইকোসিসের ঝুঁকি বাড়ে।
আইনপ্রণেতারা গাঁজা বৈধকরণের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন এর মাধ্যমে অবৈধ মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে তা সত্য হলেও, তরুণ সমাজে এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও দায়িত্বশীল নীতিমালা দেখা যাচ্ছে না। অনেক রাজ্যে গাঁজার দোকান স্কুল ও কলেজের আশপাশেই গড়ে উঠেছে, যা কিশোরদের জন্য একটি স্পষ্ট প্রলোভন তৈরি করছে।
এখানে প্রশ্ন আসে সমাধান কী? গাঁজাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়তো আর বাস্তবসম্মত নয়। তবে বৈধতার পাশাপাশি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, বয়সভিত্তিক কঠোর প্রয়োগ, বিজ্ঞাপনের সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি সচেতনতামূলক শিক্ষার বিকল্প নেই। পরিবার, স্কুল ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যেন তরুণরা গাঁজাকে 'নিরীহ অভ্যাস' হিসেবে না দেখে এর সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়।

গাঁজা বৈধতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক নতুন সামাজিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সাফল্য নির্ভর করবে আমরা কতটা দায়িত্বশীলভাবে এর ব্যবস্থাপনা করি তার ওপর। নচেৎ, আজকের আর্থিক লাভ ভবিষ্যতে এক প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও সম্ভাবনার ওপর বড় মূল্য চাপিয়ে দিতে পারে যার খেসারত দিতে হবে পুরো সমাজকেই।
২০২৬ সালে কি গাঁজা বৈধ বা পুনঃতালিকাভুক্ত হবে?
আগের বছরগুলোর তুলনায় ২০২৫ সালে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে গাঁজা বৈধকরণ নিয়ে তেমন বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি সাম্প্রতিককালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত একটি নির্বাহী আদেশ ছাড়া। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলছে, ২০২৬ সাল গাঁজা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তনের বছর হতে পারে।
চলতি বছরে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। টেক্সাসে চিকিৎসা-গাঁজা কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়েছে, আর গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট রাজ্যে টিএইচসি (টিএইচসি) পণ্যের ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার বিল ভেটো করেছেন। ডেলাওয়্যার--এ আগস্টে বিনোদনমূলক গাঁজার প্রথম বিক্রি হয়েছে রাজ্যে এটি বৈধ হওয়ার দুই বছর পর। কেনটাকি-তেও এ বছর প্রথম চিকিৎসা-গাঁজা ডিসপেনসারি খুলেছে।
আগামী বছর ম্যাসাচুসেটস প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিয়ন্ত্রিত সামাজিক পরিবেশে গাঁজা সেবনের অনুমতি দেবে। প্রায় পাঁচ বছর আগে চিকিৎসা-গাঁজা বৈধ করার পর আলাবামা ২০২৬ সালে প্রথম ডিসপেনসারি খোলার পথে রয়েছে।
এদিকে ফ্লোরিডা-তে ২০২৬ সালে বিনোদনমূলক গাঁজা ব্যালটে তোলার উদ্যোগ চলছে যদিও ২০২৪ সালে ভোটাররা প্রস্তাবটি নাকচ করেছিলেন। ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প নিজেই। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি বলেন, ফ্লোরিডায় গাঁজা বৈধ করার সংশোধনীতে তিনি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন এবং ট্রুথ সোশ্যাল -এ লেখেন, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অল্প পরিমাণ গাঁজার কারণে অপ্রয়োজনীয় গ্রেপ্তার ও কারাবাস বন্ধ করার সময় এসেছে। তিনি নির্বাচিত হলে গাঁজা সংস্কারে কাজ করার কথাও বলেন।
ডিসেম্বরের শুরুতে জানা যায়, ফেডারেল পর্যায়ে গাঁজাকে তফসিল ৩ ওষুধে পুনঃতালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা বিবেচনা করছিল ট্রাম্প প্রশাসন যা কয়েক বছর ধরেই আলোচনায় ছিল। বড়দিনের এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প এ প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। প্রায় দুই বছর আগে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ গাঁজার শ্রেণি বদলের সুপারিশ করেছিল মাদক প্রয়োগকারী প্রশাসন-কে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি তখন থমকে যায়।
বর্তমানে গাঁজা তফসিল ১ তালিকায় হেরোইন, এলএসডি ও এক্সট্যাসির সঙ্গে। তফসিল ২-তে গেলে এটি কেটামিন, টেস্টোস্টেরন ও কোডিনযুক্ত টাইলেনলের মতো ওষুধের কাতারে পড়বে। তবে পুনঃতালিকাভুক্তি মানে সারা দেশে বিনোদনমূলক গাঁজা বৈধ হয়ে যাবে—এমন নয়। এটি ফেডারেল নিয়ন্ত্রণের আওতায়ই থাকবে।
এই পরিবর্তনে গাঁজার চিকিৎসাগত ব্যবহারকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, অপব্যবহারের ঝুঁকি তুলনামূলক কম এমন মূল্যায়ন আসবে, গবেষণা সহজ হবে এবং কোম্পানিগুলোর ফেডারেল করের বোঝা কমতে পারে। এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাহী আদেশটি মূলত চিকিৎসা-গাঁজা ও সিবিডি (ক্যানাবিডিওল) নিয়ে গবেষণা বাড়ানোর দিকে নজর দেয়।
ট্রাম্পও জোর দিয়ে বলেন, এতে বিনোদনমূলক গাঁজা দেশজুড়ে বৈধ হচ্ছে না। 'ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ ব্যবহার করবেন না, ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন। তবে চিকিৎসাগত প্রয়োগে সতর্কভাবে ব্যবহৃত হলে গাঁজার বৈধতা স্বীকার করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন। গাঁজা কবে তফসিল ৩ হবে তার নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে ২০২৬ সালে হেম্প শিল্পে বড় ধাক্কার আশঙ্কা আছে। নভেম্বরে স্বাক্ষরিত বাজেট আইনে দীর্ঘদিনের একটি ফেডারেল ফাঁকফোকর বন্ধ করা হয়েছে। আইনের ভাষ্য অনুযায়ী, ০.৩ শতাংশের বেশি টিএইচসি-যুক্ত পণ্য নিষিদ্ধ হবে এবং সিবিডি থেকে উৎপন্ন ডেল্টা-৮-এর মতো পণ্যও নিষিদ্ধ হবে। বিধানটি কার্যকর হবে নভেম্বর ২০২৬ থেকে।
বর্তমানে তিন ডজনের বেশি অঙ্গরাজ্যে কোনো না কোনোভাবে গাঁজা বৈধ—অনেক ক্ষেত্রে কম টিএইচসি বা সিবিডি-যুক্ত পণ্যসহ। পাশাপাশি, কংগ্রেসে এমন উদ্যোগও রয়েছে যাতে গাঁজা বৈধকরণকে পুরোপুরি অঙ্গরাজ্যের সিদ্ধান্তে ছেড়ে দেওয়া হয়। চলতি বছর হাউসে উত্থাপিত দ্বিদলীয় স্টেটস ২.০ আইন ফেডারেল নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে রাজ্যগুলোকে নিজস্ব নীতি নির্ধারণের সুযোগ দিতে চায়। বিলটি এপ্রিলে হাউস এনার্জি অ্যান্ড কমার্স কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি