১০ মে ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১১:২২ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা

জামিল লিমন, নাহিদা বৃষ্টি ও হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়াহ (মাঝে)

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। অভিযোগ রয়েছে, মরদেহ গোপন করার উপায় জানতে তিনি চ্যাটজিপিটির সহায়তা নিয়েছিলেন।
হিলসবরো স্টেট অ্যাটর্নির অফিস শুক্রবার ২৬ বছর বয়সী হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়েহর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে নোটিশ দাখিল করে। এর মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে একটি গ্র্যান্ড জুরি তাকে জামিল লিমন ও নাহিদা ব্রিস্টিকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তার বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির হত্যার দুটি অভিযোগসহ আরও একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিহত দুইজনই বাংলাদেশের নাগরিক এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) ২৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ছিলেন। তারা ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হন।
তদন্তে নতুন মোড় আসে যখন গোয়েন্দারা জানতে পারেন, লিমনের রুমমেট আবুঘারবিয়েহ নাকি মরদেহ কীভাবে সরিয়ে ফেলা যায় সে বিষয়ে চ্যাটজিপিটির কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এরপর থেকেই তিনি হেফাজতে আছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লিমন প্রায়ই আবুঘারবিয়েহ সম্পর্কে অভিযোগ করতেন। একবার তিনি তার মৃত প্রেমিকাকে বলেছিলেন, তার রুমমেট 'মানসিকভাবে বিপজ্জনক।'
২৪ এপ্রিল মোবাইল ফোনের লোকেশন ও লাইসেন্স প্লেট রিডার ডেটার মাধ্যমে গোয়েন্দারা একটি সেতুর কাছে লিমনের মরদেহ শনাক্ত করেন।
মরদেহে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল এবং সেটি বাঁধা অবস্থায় ছিল বলে জানানো হয়। ২৬ এপ্রিল ট্যাম্পার একটি জলপথ থেকে ব্রিস্টির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তল্লাশি পরোয়ানার মাধ্যমে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, রান্নাঘর থেকে আবুঘারবিয়েহর শয়নকক্ষ পর্যন্ত রক্তের দাগ ছিল এবং তার কক্ষের কার্পেট রক্তে ভেজা ছিল।
পুলিশ অ্যাপার্টমেন্টের আবর্জনা কম্প্যাক্টর থেকে লিমনের মানিব্যাগ ও রক্তমাখা কাপড় উদ্ধার করে।
আবুঘারবিয়েহর মা হায়া আবুঘারবিয়েহ প্রসিকিউটরদের জানান, তার ছেলের রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ছিল এবং অতীতে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সহিংস আচরণ করেছেন। আবুঘারবিয়েহর আদালতে অভিযুক্ত হিসেবে হাজিরার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ মে।
হত্যাকান্ডের  'ভয়াবহ' তথ্য
হত্যাকান্ডের ঘটনায় 'ভয়াবহ' তথ্য দিয়েছেন হিলসবরো কাউন্টির শেরিফ চাদ ক্রোনিস্টার। গত শুক্রবার (১ মে)  হিলসবরো কাউন্টির শেরিফ ক্রোনিস্টার জানান, ২৬ এপ্রিল, রোববার টাম্পা বে এলাকার একটি সেতুর কাছে উদ্ধার হওয়া মানবদেহের অংশ ২৭ বছর বয়সী নাহিদা বৃষ্টির। বৃষ্টি এবং তার বন্ধু, সহপাঠী জামিল লিমন (২৭) গত ১৬ এপ্রিল টাম্পায় শেষবার দেখা গিয়েছিল।
এর আগে ২৪ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতুতে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে তাদের সহবাসী হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়াহ (২৬) গ্রেপ্তার হন এবং তার বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ পরিকল্পিত প্রথম-ডিগ্রি হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়।
দুই দিন পর ঘটনাস্থলের কাছেই আরেকটি কালো প্লাস্টিকের ব্যাগ দেখা যায়, যেটিও গিঁট দিয়ে বাঁধা ছিল লিমনের মরদেহ যেভাবে পাওয়া গিয়েছিল তার মতোই। এলাকায় মাছ ধরতে যাওয়া দুই কায়াক আরোহী ব্যাগটি খুঁজে পান। তাদের একজনের মাছ ধরার সুতা ব্যাগে আটকে গেলে তিনি কাছে গিয়ে দেখেন ব্যাগটি খোলা এবং ভেতরে মানবদেহের মতো কিছু রয়েছে। তাদের ভাষায়, ব্যাগটি থেকে 'বর্ণনাতীত' দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল।
শেরিফ জানান, ডিএনএ প্রযুক্তি, দাঁতের চিকিৎসার রেকর্ড এবং পরনের পোশাকের ভিত্তিতে ব্রিস্টির মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং ধর্মীয় কারণে মরদেহগুলো বাংলাদেশে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
ইউনিভার্সিটির মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি ও লিমন দুজনই মুসলিম ছিলেন। বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ক্যাম্পাসেই থাকতেন।
তদন্তকারীরা জানান,বৃষ্টির মরদেহটি 'উন্নত পর্যায়ের পচন'-এ ছিল। নজরদারি ভিডিওতে তাকে শেষবার যে পোশাকে দেখা গিয়েছিল, উদ্ধার হওয়া দেহে একই ধরনের পোশাক পাওয়া যায়।
গত শুক্রবার তদন্তকারীরা বাংলাদেশে বৃষ্টির পরিবারকে জানান, তারা ধারণা করছেন বৃষ্টির নিহত হয়েছেন। বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত জানান, তাদের অ্যাপার্টমেন্টে বিপুল পরিমাণ রক্ত পাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
তদন্তে আরও জানা যায়, আবুঘারবিয়াহ শেষ দিন লিমন ও বৃষ্টিকে টাম্পা থেকে ক্লিয়ারওয়াটারে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি তাদের গাড়িতে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও, মোবাইল ফোনের লোকেশন ডেটা দেখানোর পর তা স্বীকার করেন।
পুলিশ জানায়, ওই রাতেই তিনি ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইসোল ওয়াইপস এবং এয়ার ফ্রেশনার কিনেছিলেন। পরদিন তার অবস্থান তথ্য অনুযায়ী তিনি হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে গিয়ে কিছু সময় থেমেছিলেন।
এছাড়া তার রুমমেট জানান, তিনি তাকে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ডাম্পস্টারে কার্ডবোর্ড বক্স ফেলতে দেখেছেন। রান্নাঘরের একটি ম্যাটে পাওয়া ডিএনএ বৃষ্টির সঙ্গে মিলে গেছে এবং ডাম্পস্টার থেকে লিমনের ছাত্র পরিচয়পত্র ও ক্রেডিট কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা আরও বলেন, ১৩ এপ্রিল আবুঘারবিয়াহ চ্যাটজিপিটি -কে প্রশ্ন করেছিলেন: 'একজন মানুষকে যদি কালো গারবেজ ব্যাগে রেখে ডাম্পস্টারে ফেলা হয়, তাহলে কী হয়?
২৪ এপ্রিল টাম্পার একটি বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তিনি নিজেকে ঘরের ভেতরে আটকে রেখেছিলেন, ফলে বিশেষ অস্ত্র ও কৌশল ইউনিট  (সোয়াট) মোতায়েন করা হয়। পরে তাকে একটি নীল তোয়ালে পরা অবস্থায় হাত উঁচু করে বাড়ি থেকে বের হতে দেখা যায়।
তার বিরুদ্ধে মৃতদেহ গোপন করা বা সরানো, কর্তৃপক্ষকে মৃত্যুর তথ্য না জানানো, প্রমাণ নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। মঙ্গলবার আদালত তাকে জামিন দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বর্তমানে তিনি টাম্পার ফালকেনবার্গ রোড কারাগারে আটক রয়েছেন বলে শেরিফ অফিসের রেকর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে।
 

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি