বাংলাদেশের ফিরে আসা সন্তান
টাইম ম্যাগাজিনে তারেকের সাক্ষাৎকারেও 'খাম্বা' প্রসঙ্গ
তারেক রহমান
নোমান সাবিত: তারেক রহমান এখন কণ্ঠ হারিয়েছেন। বাংলাদেশের মতো ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশের একজন সম্ভাব্য নেতা হিসেবে এটি মোটেও আদর্শ পরিস্থিতি নয়। বিষয়টির মধ্যে এক ধরনের বিদ্রূপও আছে, কারণ কার্যত বিরোধী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের সময় তারেক রহমানের বক্তব্য এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের গণমাধ্যমে প্রচার নিষিদ্ধ ছিল।
টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, আমার শরীর এখন এই দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে,নিজের পারিবারিক বাড়ির বাগানে যেখানে বোগেনভেলিয়া ও গাঁদা ফুলে ঘেরা পরিবেশ। ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফিরে এটিই তার প্রথম সাক্ষাৎকার।
তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, আসলে আমি এমনিতেই খুব ভালো বক্তা নই। কিন্তু যদি আমাকে কিছু করতে বলেন, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।
গত কয়েক সপ্তাহ তার জন্য ছিল নাটকীয়। ২৫ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় ফেরেন, যেখানে রাতভর অপেক্ষা করা কয়েক লাখ সমর্থক তাকে অভ্যর্থনা জানায়। মাত্র পাঁচ দিন পর তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা যান। রাজধানীতে লাখো মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেন।
চোখ ভেজা কণ্ঠে তারেক বলেন, আমার হৃদয় খুব ভারী। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে আমি শিখেছি দায়িত্ব পেলে তা পালন করতেই হবে।
এই দায়িত্বই হয়তো তাকে প্রধানমন্ত্রিত্বের পথে নিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার পতনের ১৮ মাস পর ঘোষিত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানই সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। তিনি নিজেকে উপস্থাপন করছেন স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে আসা রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি ও তরুণ বিপ্লবীদের স্বপ্নের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে।
বাংলাদেশ এখন বহু সংকটে ভুগছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল টাকা সাধারণ মানুষের আয় কমিয়ে দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ হয়েছে, যা শিল্প ও জ্বালানি সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যুব বেকারত্ব ১৩.৫ শতাংশ, প্রতিবছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে তারেক রহমান নিজেও বিতর্কের বাইরে নন। তার পরিচয় মূলত বংশগত—তিনি খালেদা জিয়া ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পুত্র। সমর্থকদের কাছে তিনি নির্যাতিত উদ্ধারকর্তা, সমালোচকদের কাছে ক্ষমতার মোহে অন্ধ এক সুবিধাভোগী উত্তরাধিকারী।
তিনি বলেন, আমি এখানে এসেছি শুধু বাবা-মায়ের ছেলে বলে নয়। আমার দলের সমর্থকদের কারণেই আমি এখানে।
ডিসেম্বরের শেষের জনমত জরিপে দেখা যায়, বিএনপির প্রতি সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ, জামায়াতের ১৯ শতাংশ।
কিন্তু উদ্বেগও আছে। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপির শাসনামলে টানা চার বছর বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, হাসিনাকে সরাতে নিহত প্রায় ১,৪০০ মানুষের রক্তের বিনিময়ে আবার নতুন কোনো স্বার্থপর শাসক তৈরি হবে না তো?
তারেক রহমান সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।
বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অন্যতম বড় অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। দেশটি এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ও রপ্তানি বাজার। একই সঙ্গে চীনও বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত সুবিধার কারণে বাংলাদেশে প্রভাব বাড়াতে চায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের সংস্কার কর্মসূচি গণতন্ত্র রক্ষার আশা জাগিয়েছে। তারেক বলেন, যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি শান্ত স্বভাবের, অন্তর্মুখী মানুষ। লন্ডনে তার প্রিয় কাজ ছিল পার্কে হাঁটা আর ইতিহাস বই পড়া। প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ আটবার দেখেছি!
তার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ১২ হাজার মাইল খাল খনন, প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ রোপণ, ঢাকায় ৫০টি সবুজ অঞ্চল, বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্ব।
তিনি বলেন, আমি যদি ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারি, মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।
তবে তার অতীত ভাবমূর্তি ভিন্ন। ‘খাম্বা তারেক’ নামে পরিচিত তিনি একটি বিদ্যুৎ খুঁটি দুর্নীতির অভিযোগের কারণে। ২০০৮ সালের এক মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তায় তাকে বলা হয়েছিল 'লুটেরা শাসনের প্রতীক'।
২০০৭–২০০৮ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি ৮৪টি মামলায় ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন। নির্যাতনের কারণে আজও শারীরিক সমস্যা রয়েছে।
হাসিনার শাসনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগোলেও গণতন্ত্র ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৩,৫০০ মানুষ গুম হয়। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, বৃদ্ধ সবাই রাস্তায় নামে। হাসিনা পালিয়ে ভারতে যান।
আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ইসলামপন্থার পুনরুত্থান। জামায়াত এখন তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে তারা বড় জয় পেয়েছে।
তারেক বলেন, 'মানুষ চায় এমন এক গণতন্ত্র যেখানে তারা কথা বলতে পারে।'
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণদের চোখে ভারত এখন প্রধান খলনায়ক।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আজকের বাংলাদেশে কেউ আর ৫০ বছর আগের ইতিহাস শুনতে চায় না। তারা চায় এমন নেতা, যিনি শোনেন, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করেন।
তারেক রহমান বলেন, তার সবচেয়ে বেশি যেটা মিস হয় স্বাধীনতা। নিজের বাড়ির চারপাশে কাঁটাতারের বেষ্টনী দেখিয়ে বলেন, 'আমি ক্লস্ট্রোফোবিক অনুভব করি।'
তবে তিনি হতাশ নন। তিনি বিশ্বাস করেন, ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব আসে। নিজের প্রিয় উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করেন:
'বড় ক্ষমতার সঙ্গে বড় দায়িত্ব আসে—আমি সত্যিই এটা বিশ্বাস করি।'
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
দেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার হয়েছে: ডা. জুবাইদা রহমান
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি