৭ নভেম্বর ২০২৬

সুনামগঞ্জে বিএনপিতে বিভক্তির রাজনীতি, বিপ্লব ও সংহতি দিবসেও দুই বলয়ের পৃথক কর্মসূচি

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৫ এএম
সুনামগঞ্জে বিএনপিতে বিভক্তির রাজনীতি, বিপ্লব ও সংহতি দিবসেও দুই বলয়ের পৃথক কর্মসূচি

সাইফ উল্লাহ, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা বিএনপিতে বিভক্তির রাজনীতি প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক সমাবেশ—সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে দুই বলয়ের পৃথক অবস্থান। একদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীর অনুসারীরা, অন্যদিকে তাঁর বিরোধী হিসেবে পরিচিত তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কর্মসূচি ঘিরেও এই বিভক্তির প্রতিফলন ঘটেছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীকে কেন্দ্র করে উপজেলা বিএনপিতে নতুন একটি বলয় তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় না থাকা এবং বিএনপির রাজনীতিতে আগে তেমন সম্পৃক্ত ছিলেন না—এমন কিছু ব্যক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। বিষয়টি তৃণমূলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। এ ছাড়া নাছির চৌধুরীর পারিবারিক পরিমণ্ডলের কিছু বক্তব্য এবং বিএনপির বাইরের কয়েকজন ব্যক্তির রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল এবং উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মইন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বে তৃণমূলের একটি অংশ সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব মইন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান ও প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ইকবাল চৌধুরীসহ স্থানীয় নেতারা সংসদ সদস্যের বলয়ের বাইরে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে পৃথক সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেন।

এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও সমাবেশের প্রবণতা বাড়তে থাকে। এক পক্ষের কর্মসূচির পর অন্য পক্ষের কর্মসূচি আয়োজন যেন দিরাই বিএনপির রাজনীতিতে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এতে দলের সাংগঠনিক ঐক্য ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসেও সেই বিভক্তির চিত্র দেখা গেছে। দিবসটি উপলক্ষে শনিবার (৭ নভেম্বর) সংসদ সদস্যবিরোধী হিসেবে পরিচিত তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেন। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দিরাই পৌর শহরের থানা রোডে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে থানা পয়েন্টে গিয়ে আলোচনা সভায় মিলিত হয়।

উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মইন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান, উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব লিপন হাসান চৌধুরীসহ বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে রোববার (৮ নভেম্বর) সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীর অনুসারীরা একই দিবস উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীর।

দুই পক্ষের পৃথক কর্মসূচিকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, এর আগেও সংসদ সদস্যের অনুসারীরা সমাবেশ করেছেন। পরদিন তৃণমূল বিএনপি সমাবেশ করে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটিয়েছে। এমনকি ১৪৪ ধারা জারি করেও সেদিনের সমাবেশ ঠেকানো যায়নি। দিরাই শহর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতিতে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছিল। তাঁর ধারণা, আগের কর্মসূচির রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়েই এবার সংসদ সদস্যের অনুসারীরা পরদিন কর্মসূচি রেখেছেন। তবে রোববারের কর্মসূচিতে কতটা লোকসমাগম হয়, সেটিও দেখার বিষয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সাংগঠনিক শক্তি নির্ভর করে ঐক্য, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণের ওপর। কিন্তু দিরাই বিএনপিতে একই দিবসকে কেন্দ্র করে পৃথক কর্মসূচি আয়োজনের মধ্য দিয়ে দলীয় ঐক্যের সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের চেয়ে বেশি লোকসমাগম ঘটিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণের চেষ্টা করছে—এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, সাংগঠনিক পদ-পদবি বণ্টন এবং স্থানীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ মীমাংসা না হলে এই বিভক্তি আরও গভীর হতে পারে। এতে শুধু উপজেলা ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমই বাধাগ্রস্ত হবে না, ভবিষ্যতের স্থানীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দলটির প্রভাবও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


বিপি/কেজে

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি