৪ মে ২০২৬

পঞ্চগড় ভ্রমণ : এক রাতের সিদ্ধান্ত, এক জীবনের স্মৃতি

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:২৯ পিএম
পঞ্চগড় ভ্রমণ : এক রাতের সিদ্ধান্ত, এক জীবনের স্মৃতি

--তৌফিক ইসলাম

 

দিনাজপুরের এক শীতের রাত।
ফ্ল্যাটের ঘরে জমে থাকা আড্ডা—
বন্ধুরা দিনের সব ক্লান্তি ভুলে হাসছে, গান গাইছে, গল্পে মেতে আছে।
ও আমার পরিচয় টা দিয়ে ফেলি — আমি তৌফিক, দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স ডিপারমেন্টের ৬ষ্ঠ পর্বের ছাত্র— আমি চুপচাপ সবার দিকে তাকিয়ে শুধু ভাবছিলাম।

হঠাৎ বুকের গভীরে অদ্ভুত এক কাঁপুনি উঠল।
মনে হলো—আজকের রাতটা যেন অন্যরকম।
অজানা এক টান বারবার মাথায় ঘুরতে লাগল—

“কোথাও ঘুরে গেলে কেমন হয়?”

এবং প্রথম যে নামটি ঝলসে উঠল—
পঞ্চগড়।

ঠাণ্ডা, কুয়াশা, চা-বাগান, ডাকবাংলো, আর দূর আকাশে সেই মহিমান্বিত কাঞ্চনজঙ্ঘা…
মনে হচ্ছিল জায়গাটা যেন আমাকে ডাকছে।

তাই আর দেরি করলাম না।

আড্ডার মাঝেই বলে ফেললাম—
“মামারা! চলো পঞ্চগড় যাই। একটু হাওয়া বদল করি!”

সবাই প্রথমে হেসে গড়িয়ে পড়ল—
“এই রাতে? হঠাৎ? তুই ঠিক আছিস?”

কেউ বলল, “কাল ক্লাস আছে ভাই।”
কেউ বলল, “ঘুম আসতেছে, যামু না।”

বুঝলাম, এখন আমার গোপন অস্ত্রটাই কাজে লাগাতে হবে।
হাসতে হাসতেই বললাম—

“দেখো ভাই, আর কতদিন আমরা একসাথে থাকব?
ক’টা মাস পর কে কোথায় চলে যাব—বলতে পারবা?
হয়তো এই আড্ডাটাই শেষ আড্ডা।
চলো না, একবার সবাই মিলে একটা স্মৃতি বানাই।”

কথাগুলো যেন কোথাও গিয়ে ধাক্কা মারল।
ধীরে ধীরে সবাই চুপ হয়ে গেল।
তারপর একে একে…

“চলো…”
“চলো ঘুরে আসি!”
“জীবনটা একটাই ভাই—চলো!”

ঘরটা মুহূর্তেই উৎসবে পরিণত হলো।
কেউ ব্যাগ গোছাচ্ছে,
কেউ চার্জার খুঁজছে,
কেউ টিকিট অ্যাপ খুলেছে,
কেউ আবার জিজ্ঞেস করছে—“টুথব্রাশ লাগবে নাকি?”
আরেকজন বলছে—“ভাই, ঠাণ্ডায় জমে যাবো না তো?”

রাত ২টার বিদায় : শহর ঘুমাচ্ছে, আমরা জেগে উঠছি

ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়াটা যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য—
রাস্তাগুলো কুয়াশায় ঢাকা,
লাইটপোস্টগুলো ধোঁয়াটে আলো ছড়াচ্ছে,
চারপাশে নিস্তব্ধতার রাজত্ব।

আর আমরা—ছয়–সাতজন বন্ধুর দল—ব্যাগ কাঁধে নিয়ে চলেছি স্টেশনের পথে।

স্টেশনে দাঁড়িয়েই মনে হলো—
ভোরের বাতাসে শহরটা অদ্ভুত নীরব ও সুন্দর।

ট্রেন আসতেই বগিতে উঠে গেলাম দৌড়ে।
তারপর শুরু হলো—

গান, সেলফি, হাসি, গল্প, উল্লাস…
পুরো বগিটাই যেন আমাদের তারুণ্যের উৎসবে ভরে গেল।
জানালার বাইরে কুয়াশা উড়ে যাচ্ছে,
আর আমরা ছুটছি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতির দিকে।

ভোর ৫:৩০ — পঞ্চগড়ের দরজায় প্রথম ধাক্কা

ট্রেন থামতেই নেমে আসা,
আর সাথে সাথে ঠাণ্ডার এমন ঝাপটা—

এটা ঠাণ্ডা নয়,
এটা যেন বরফের দাঁত!

দিনাজপুরের শীত আমরা হুডি পরে সামলাই,
কিন্তু পঞ্চগড়ের বাতাস—
সরাসরি বুক ভেদ করে ঢুকে যায়।

চায়ের দোকানে বসে ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়েই বুঝলাম—
আজকের গল্পটা অন্যরকম হতে যাচ্ছে।

তেঁতুলিয়ার পথে : চা-বাগানের রাজ্য পেরিয়ে

স্টেশন থেকে ভ্যান নিলাম।
সেই ভ্যানের হাওয়া—
শীত নয়;
বরং বরফের ছুরি!

হাত-পা জমে কাঠ,
কথা বলা কষ্ট,
এক বন্ধু তো চিৎকার করেই বলল—
“ভাই! ঠাণ্ডা কামড়ে ধরছে!”

বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে তেঁতুলিয়াগামী বাসে উঠলাম।
রাস্তায় যতদূর চোখ যায়—
ডানে-বামে শুধু চা-বাগান।

সবুজের এমন রাজত্ব—
যেন পুরো পৃথিবীটা চায়ের পাতায় মোড়া।

ডাকবাংলো : আরেক পৃথিবীতে প্রবেশ

তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোতে পৌঁছে মনে হলো—
এটা বাংলাদেশ নয়, যেন কোনো সিনেমার সেট।

নিস্তব্ধতা,
কুয়াশায় ঢাকা মাঠ,
হিমেল হাওয়া,
আর দূর আকাশে পাহাড়ের অদৃশ্য আভা।

ভ্যানের মামা হাসতে হাসতে বলল,
“ভাগ্য ভালো হলে আজ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবেন।”
তার কথায় আমাদের ভেতরে যেন আগুন লেগে গেল।

দৌড়ে দাঁড়ালাম ডাকবাংলোর পেছনের উঁচু জায়গাটায়—
এবং শুরু হলো অপেক্ষা।

কাঞ্চনজঙ্ঘা : জীবনের সবচেয়ে নীরব বিস্ময়

হঠাৎ দূরের আকাশে সাদা এক রেখা দেখা দিল।
মিনিট কয়েকের মধ্যে সেই রেখা বড় হয়, স্পষ্ট হয়—
আর একসময় সে-ই দাঁড়িয়ে থাকে চোখের সামনে—

কাঞ্চনজঙ্ঘা।

দুধ-সাদা
বিশাল
শান্ত
গম্ভীর
অতুলনীয়।

সূর্য ওঠার সাথে সাথে গোলাপি আলো পাহাড়ে পড়ে
অবর্ণনীয় রঙের জন্ম দিল—
যা শুধু চোখে দেখা যায়,
ভাষায় লেখা যায় না।

বন্ধুরা কেউ ছবি তুলছে,
কেউ ভিডিও করছে,
কেউ আবার নীরব দাঁড়িয়ে।

আর আমি মনে মনে বললাম—
“এটাই জীবনের সবচেয়ে শান্ত সকাল।”

একজন বলল—
“মনে হচ্ছে দেবতা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে!”
আরেকজন বলল—
“এই দৃশ্য দেখে জীবনে আর কিছু চাই না।”

কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল,
আর আমরা তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে।

Kazi & Kazi Tea Estate : চায়ের গন্ধে ভেজা রূপকথা

কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা শেষে আমরা ভ্যান নিয়ে রওনা দিলাম
Kazi & Kazi Tea Estate—এর উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশের একমাত্র বড় অর্গানিক চা-বাগান।
রাসায়নিক নেই,
বরফ-পান্না শিশিরে,
হিমেল হাওয়ায়,
সূর্যের নরম আলোয়
চা পাতারা বড় হয়।

বাগানের বাতাসে চায়ের যে সুবাস—
তা শুধু নাকে নয়,
মনের গভীরে গেঁথে যায়।

বন্ধুরা গাছ ছুঁয়ে বলল—
“ভাই, এই পাতাই কি ইউরোপ যায়?”
আরেকজন হাসল—
“আজ জীবনটা অন্যরকম লাগছে!”

চা-বাগানের ভেতরে ছোট ছোট ঘর—
ঠিক জাপানি স্টাইলের।
লো-রুফ, বাঁশের পথ, কাঠের লণ্ঠন,
শান্ত নিস্তব্ধ পরিবেশ—
মনে হচ্ছিল আমরা যেন জাপানের কোনো গ্রামে আছি।

ফিরে আসা : কিন্তু মন পড়ে রইল পাহাড়ে

ফেরার পথে মনে হলো—
আমরা যেন নিজের একটা অংশ রেখে যাচ্ছি কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছে।

যাত্রা শেষ হলো,
কিন্তু স্মৃতি শেষ হলো না।

বন্ধুত্বের হাসি,
চায়ের সুবাস,
শীতের কামড়,
আর সেই গোলাপি ভোরের আলো—
সব মিলিয়ে তৈরি হলো জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

শেষ কথাঃ পঞ্চগড় — আমাদের তারুণ্যের রং

পঞ্চগড় শুধু একটি ভ্রমণ নয়,
এটা আমাদের বন্ধুত্বের ক্যানভাস,
আমাদের তারুণ্যের ভোর,
আমাদের স্মৃতির পাহাড়।

জীবনের পথে আমরা হয়তো আলাদা হয়ে যাবো—
কেউ চাকরি করবে,
কেউ দূর শহরে যাবে,
কেউ হয়তো বিদেশে।

কিন্তু এক ভোরে দেখা সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা
চিরকাল একই বাক্য বলবে—

“বন্ধুরা… আবার এসো।”

 

বিপি/টিআই

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি