নিউ ইয়র্কে হোম কেয়ার জালিয়াতচক্রের কারণে স্বাস্থ্যসেবার ১৫ হাজার কোটি টাকা উধাও
নোমান সাবিত: যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের এক উদার স্বাস্থ্য কর্মসূচিকে কাজে লাগিয়ে নিজের অসুস্থ মাকে দেখাশোনার নামে বল্লাল হোসেন পরিবারের এক ডজন সদস্যকে কেয়ারগিভার হিসেবে নিবন্ধন করান। ছয় বছরে তারা ম্যানহাটনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকা বয়স্ক নারীটির দেখাশোনার জন্য ৩ লাখ ৪৮ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা)পান। কিন্তু বাস্তবে তার মা পুরো সময়টাই ছিলেন বাংলাদেশে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য,পরিদর্শকরা এলে হোসেন তার ভাইকে মায়ের ভূমিকায় বসিয়ে প্রতারণা চালিয়ে যান, শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ার আগে পর্যন্ত। প্রসিকিউটরদের মতে, পরে তাকে গ্র্যান্ড লারসেনির দায়ে সাজা দেওয়া হয়।
নিউ ইয়র্ক সিটিতে চালু হওয়া কনজিউমার ডিরেক্টেড পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (সিডিপ্যাপ) বা ভোক্তা-নির্দেশিত ব্যক্তিগত সহায়তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের সদস্য বা প্রিয়জনদের দিয়ে প্রতিবন্ধী ও গৃহবন্দী মানুষদের পরিচর্যা করানো। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই কর্মসূচি জালিয়াতি ও অপচয়ে জর্জরিত।
১৯৯৪ সালে শুরু হওয়া কনজিউমার ডিরেক্টেড পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (সিডিপ্যাপ) মূলত বয়স্কদের নার্সিং হোমে যাওয়ার চাপ কমাতে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোনো যোগ্যতা বা চিকিৎসা সনদ ছাড়াই কেয়ারগিভার হওয়ার সুযোগ থাকায় তদারকি ছাড়াই এটি ফুলে-ফেঁপে ওঠে।
দ্য পোস্ট অন্তত ১৭৯ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ২শত কোটি) সরাসরি চুরি হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে গত ১০ বছরে, আর মধ্যস্বত্বভোগীদের পেছনে করদাতাদের কমপক্ষে ১ বিলিয়ন ডলার ( বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৩ শত কোটি) অপচয় হয়েছে।
২৭ বছর ধরে নিউ ইয়র্কে মেডিকেইড জালিয়াতির মামলা চালানো আইনজীবী রিচার্ড হ্যারো বলেন,মিনেসোটা বড় কেলেঙ্কারি মনে হলে, সেটাকে ১০ দিয়ে গুণ করুন। সিডিপ্যাপই সবচেয়ে বড় জালিয়াতি, কারণ সবকিছু মানুষের বাড়ির ভেতরেই ঘটে। কর্মসূচির খরচও চার গুণের বেশি বেড়েছে।
২০১৯ সালে সিডিপ্যাপ-এ ব্যয় ছিল ২.৫ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫হাজার কোটি টাকা) কিন্তু ২০২৩ সালে তা বেড়ে নিউ ইয়র্কের মেডিকেইড ব্যয়ের ৯.১ বিলিয়ন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার টাকা) পৌঁছায়। তখন ২ লাখ ৫০ হাজার রোগী ও ৪ লাখ কেয়ারগিভার এতে যুক্ত ছিল।
রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর স্বীকার করেছে, এই কর্মসূচি একটি 'আর্থিক সংকট' সৃষ্টি করেছে। এমনকি গভর্নর ক্যাথি হোকুল ২০২৪ সালে একে 'নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে সবচেয়ে অপব্যবহৃত কর্মসূচিগুলোর একটি' বলে আখ্যা দেন।
২০২৫ সালে রাজ্য সরকারের সিডিপ্যাপ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা)।
গত ছয় বছরে অন্তত তিনটি বড় জালিয়াতির মামলা সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে জাকিয়া খান ৬৮ মিলিয়ন ডলার আত্মসাতের দায়ে দোষ স্বীকার করেন।
২০২৩ সালে মারিয়ানা লেভিন ১০০ মিলিয়ন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৩ শত কোটি টাকা) মেডিকেইড জালিয়াতির দায়ে সাড়ে চার বছরের কারাদণ্ড পান।
২০১৯ সালে ফারাহ রুবানির বিরুদ্ধে ১১ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা) আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তৃণমূল পর্যায়ে কেয়ারগিভাররাও অপব্যবহার করেছে হাসপাতালে থাকা বা মৃত ব্যক্তির নামেও বিল তোলা, একই সময়ে ভিন্ন জায়গায় দুজনকে সেবা দেওয়ার দাবি করা ইত্যাদি।
২০২৪ সালে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল দুটি ব্রুকলিনভিত্তিক মধ্যস্বত্বভোগী সংস্থার সঙ্গে ১৭ মিলিয়ন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০৭ কোটি ১০ লাখ টাকা) বেশি সমঝোতা করেন, যারা মেডিকেইডে প্রতারণা করেছিল।
এরপর রাজ্য শত শত মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিয়ে জর্জিয়াভিত্তিক একক প্রতিষ্ঠান পাবলিক পার্টনারশিপ, এলএলসি (পিপিএল)-কে দায়িত্ব দেয়। এতে ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমে আসে প্রতি ব্যক্তির মাসিক খরচ ১ হাজার ডলার থেকে নেমে প্রায় ৬৮.৫০ ডলারে।
স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে, এই সংস্কারের ফলে করদাতাদের বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হচ্ছে এবং জালিয়াতির পথ বন্ধ হয়েছে। মেডিকেইড ইন্সপেক্টর জেনারেলও জানিয়েছে, ২০১৯–২০২৪ সময়ে ৩.৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত পরিশোধ শনাক্ত করে তা উদ্ধার করা হয়েছে।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি