টোকেনের মতোই এটি ৩১ ডিসেম্বর ইতিহাসে মিলিয়ে যাবে
নিউ ইয়র্ক সিটির ‘মেট্রোকার্ড’ ৩২ বছর পর বিদায় নিচ্ছে
নোমান সাবিত: নিউ ইয়র্ক সিটির গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রবেশের জন্য তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য নিউইয়র্কারের ব্যবহৃত প্রতীকী প্লাস্টিক কার্ড মেট্রোকার্ড ৩১ ডিসেম্বর ৩২ বছর বয়সে বিদায় নিচ্ছে।
নীল অক্ষর লেখা হলুদ রঙের চ্যাপ্টা আয়তাকার এই কার্ডটির অবসান ঘটছে এমটিএ (এমটিএ) ৩১ ডিসেম্বর থেকে এর বিক্রি বন্ধ করার মাধ্যমে। এর ফলে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যে ধাতব সাবওয়ে টোকেনের জায়গা মেট্রোকার্ড নিয়েছিল, সেই টোকেনের মতোই এটি এখন অচল স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে। এই পদক্ষেপটি এমটিএর সম্পূর্ণভাবে তাদের ‘ট্যাপ-অ্যান্ড-পে’ বিকল্প ব্যবস্থা ওএমএনওয়াই-তে রূপান্তরের অংশ। যদিও এমটিএ আর মেট্রোকার্ড বিক্রি করবে না, তবে আগামী বছরের কিছু সময় পর্যন্ত কার্ডটি গ্রহণ করা হবে।
এ বছরের শুরুতে মেট্রোকার্ডের অবসানের ঘোষণা দিতে গিয়ে এমটিএর চেয়ার ও সিইও জানো লিবার বলেন, ৩২ বছর পর মেট্রোকার্ডকে বিদায় জানানোর এবং ভবিষ্যতের ভাড়া পরিশোধ ব্যবস্থায় (ওএমএনওয়াই) পুরোপুরি চলে যাওয়ার সময় এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ট্যাপ-অ্যান্ড-গো পদ্ধতি শুধু সহজ ও সুবিধাজনকই নয়, এটি নতুন ছাড় ও প্রমোশনের সুযোগও তৈরি করে, যা যাত্রীদের পকেটে টাকা ফেরত দিতে পারে।
নিউ ইয়র্ক ট্রানজিট মিউজিয়ামের কিউরেটর জোডি শ্যাপিরো, যেখানে বর্তমানে মেট্রোকার্ডকে বিদায় জানিয়ে ‘বিদায়’ নামের একটি প্রদর্শনী চলছে। তিনি বলেন, তার বিশ্বাস নিউইয়র্কাররা ইতিমধ্যেই শোক অনুভব করছেন।
শ্যাপিরো বলেন, আমি মনে করি মানুষ একটু দুঃখিত যে এটি চলে যাচ্ছে। টোকেনের সময়ও এমনটাই হয়েছিল। মানুষ একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেগুলো ব্যবহার করেছিল। মেট্রোকার্ডের ক্ষেত্রেও এমন মানুষ অবশ্যই আছে।
এমটিএর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে প্রথম চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন বিলিয়নেরও বেশি মেট্রোকার্ড এনকোড করা হয়েছে। মেট্রোকার্ডের ধারণা আসে ১৯৫৩ সাল থেকে ব্যবহৃত ঝামেলাপূর্ণ টোকেনের বিকল্প হিসেবে।
শ্যাপিরো জানান, ১৯৮৩ সালে তৎকালীন এমটিএ চেয়ার রিচার্ড র্যাভিচ প্রথম টোকেনের বদলে চৌম্বকীয় স্ট্রাইপযুক্ত ভাড়া কার্ড যা ‘স্টোরড-ভ্যালু ম্যাগস্ট্রাইপ কার্ড’ নামে পরিচিত ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।
র্যাভিচ এই কার্ড চালুর বিষয়টিকে শহরের পরিবহন ব্যবস্থার প্রযুক্তি আধুনিকায়নের একটি উপায় হিসেবে দেখেছিলেন যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল।
মেট্রোকার্ড চালু হয় নতুন স্বয়ংক্রিয় ভাড়া সংগ্রহ (এএফসি) প্রযুক্তিসম্পন্ন টার্নস্টাইলের সঙ্গে। টার্নস্টাইল বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে আরও স্টেশনে মেট্রোকার্ড চালু হয় এবং ১৯৯৫ সালে এমটিএ এই কাজ সম্পন্ন করে।
একই সময়ে, শহরের বাসগুলোতেও মেট্রোকার্ড পড়তে সক্ষম ভাড়া বাক্স বসানো হয়। যাত্রীদের কার্ড ব্যবহার—বিশেষ করে ‘সোয়াইপ’ করা—শেখাতে এমটিএ একটি বড় বিজ্ঞাপন প্রচারণাও চালায়।
শ্যাপিরো বলেন, সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে খুব কম পরিবহন ব্যবস্থাই ম্যাগস্ট্রাইপ স্টোরড-ভ্যালু কার্ড ব্যবহার করত। তাই নিউইয়র্কবাসীদের এই আচরণটি শেখানো প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে সাবওয়েতে, কারণ কার্ড সোয়াইপ করা টার্নস্টাইলে টোকেন ফেলার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন।
মেট্রোকার্ড চালুর ফলে একই যাত্রায় সাবওয়ে ও বাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার ভাড়া না দিয়েই যাতায়াত সম্ভব হয়। ১৯৯৭ সালে মেট্রোকার্ড গোল্ড চালুর পর এমটিএ যাত্রীদের একাধিকবার ট্রান্সফারের সুযোগ দেয়।
এছাড়া, মেট্রোকার্ড গোল্ডের মাধ্যমে ৭ দিন ও ৩০ দিনের আনলিমিটেড পাস কেনার সুবিধা চালু হয়, যা উন্নত কার্ড প্রযুক্তির কারণে সম্ভব হয়।
শ্যাপিরো বলেন, প্রধান প্রযুক্তিগত পরিবর্তনটি ছিল ধাতব কাইনেটিক স্ট্রাইপ এনকোড করার নতুন পদ্ধতি, যা একাধিক ট্রান্সফার, ৭ বা ৩০ দিনের আনলিমিটেড ব্যবহার এবং কার্ডে টাকা রেখে ব্যবহার করার সুবিধা ও ছাড় দেওয়া সম্ভব করেছে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে মেট্রোকার্ড
বছরের পর বছর ধরে মেট্রোকার্ড সোয়াইপ করার দক্ষতা মানুষের সংস্কৃতিরই একটি অংশ হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের প্রচারণার একটি আলোচিত মুহূর্ত ছিল, যখন তাকে ব্রঙ্কসের একটি সাবওয়ে স্টেশনে ঢুকতে পাঁচবার মেট্রোকার্ড সোয়াইপ করতে হয়।
‘টুইন পিকস’ তারকা কাইল ম্যাকলকলানকেও একাধিকবার ব্যর্থভাবে সাবওয়েতে ঢোকার চেষ্টা করতে দেখা যায় যা ২০২০ সালে এইচবিও সিরিজ 'হাউ টু উইথ জন উইলসন'-এর একটি পর্বে দেখানো হয়।
মেট্রোকার্ডের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর বিজ্ঞাপন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার। পল ম্যাককার্টনির মতো সংগীতশিল্পী থেকে শুরু করে গেম অব থ্রোনস-এর মতো টিভি শোঅনেকেই মেট্রোকার্ডের পেছনে বিজ্ঞাপন দিয়েছে।
শ্যাপিরো বলেন, নিউইয়র্কারদের মেট্রোকার্ডের প্রতি নস্টালজিয়া তাদের পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে অনন্য সম্পর্কেরই প্রতিফলন। কারণ এই ব্যবস্থা মূলত লোয়ার ম্যানহাটন থেকে মানুষকে শহরের অন্যান্য অংশে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল, যা ধীরে ধীরে পুরো শহরকে গড়ে তুলেছে।
তিনি বলেন, নিউ ইয়র্ক আজ যা, তা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা ছাড়া সম্ভব হতো না। মানুষ সচেতনভাবে জানুক বা না জানুক, সম্ভবত এ কারণেই নিউইয়র্কারদের পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি গভীর আবেগ রয়েছে। টোকেন, মেট্রোকার্ড বা অবসরপ্রাপ্ত ট্রেন এসবের প্রতি তারা এক ধরনের সুরক্ষামূলক ও শ্রদ্ধাশীল অনুভূতি পোষণ করে।
মেট্রোকার্ড রেখে যাচ্ছে তার উত্তরসূরি ওএমএনওয়াই কার্ডকে এবং সেই সঙ্গে লাখো যাত্রীকে, যারা মানিব্যাগে রাখা সোনালি-নীল এই চাবিটিকে ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করবে, যা তাদের শহরের দরজা খুলে দিত।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
গুলির শব্দে হোয়াইট হাউস অবরুদ্ধ, সরিয়ে নেওয়া হলো সংবাদকর্মীদের
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি