গ্যাসের দাম বৃদ্ধিই হোক রাজনীতির আগুন
ছাবেদ সাথী
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অনেক ইস্যু আসে ও যায় অভিবাসন, যুদ্ধ, কর, স্বাস্থ্যসেবা, বেকারত্ব। কিন্তু একটি বিষয় আছে, যা প্রায় সব ভোটারের স্নায়ুতে সরাসরি আঘাত করে 'জ্বালানি গ্যাসের দাম'।
হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুম হোক বা নির্বাচনী সমাবেশ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি বারবার একটি কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন 'আমেরিকান ভোটাররা গ্যাসের দামের ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাঁর ভাষায়, মানুষ অনেক কিছু সহ্য করলেও পাম্পে দাঁড়িয়ে দাম বাড়তে দেখলে ক্ষোভ জমে ওঠে, আর সেই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে ব্যালট বাক্সে।
এটা নতুন কোনো সত্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। কাজে যাওয়া, বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছানো, বাজার করা, এমনকি সপ্তাহান্তের ছুটি—সবকিছুই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রতিদিনের জীবনের খরচের সঙ্গে গ্যাসের দাম সরাসরি জড়িত। যখন দাম বাড়ে, মানুষ শুধু বেশি টাকা দেয় না তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত বোধ করে, অর্থনীতি নিয়ে আতঙ্কিত হয়, এবং সেই আতঙ্ক শেষ পর্যন্ত রাজনীতির দিকে গিয়ে ঠেকে।

রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, উচ্চ জ্বালানি মূল্য বহু প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তায় ফাটল ধরিয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মূল্যবৃদ্ধি প্রতিটি ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের ওপর ভোটারদের চাপ বেড়েছে। ট্রাম্প এই বাস্তবতা ভালোভাবেই বোঝেন। তাই তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন, ভোটাররা গ্যাসের দামের প্রশ্নে কোনো যুক্তি, পরিসংখ্যান বা কূটনৈতিক ব্যাখ্যা শুনতে চান না। তারা শুধু দেখতে চান পাম্পে দাঁড়ালে সংখ্যাটা কম, নাকি বেশি।
চলমান মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ দিচ্ছেন তারা যেন দ্রুত ভেনেজুয়েলায় গিয়ে তেল উৎপাদন বাড়ায়, যাতে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং তেলের দাম কমে। উদ্দেশ্য একটাই: পেট্রলের দাম নামানো, আর তাতে ভোটারদের মন জয় করা। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, তেল কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা এতে খুব একটা আগ্রহী নন। কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য কোম্পানির অর্থনৈতিক টিকে থাকা ট্রাম্পের রাজনৈতিক টিকে থাকা নয়।
গত গ্রীষ্মের পর থেকে পেট্রলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জুনে যেখানে গড়ে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম ছিল ৩.১৫ ডলার, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২.৭৭ ডলারে কিছু অঙ্গরাজ্যে আরও কম। ট্রাম্প জানেন, ভোটাররা গ্যাসের দামের ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। দাম বাড়লে তারা ক্ষোভ ঝাড়ে ব্যালট বাক্সে। তবে দাম কমলে তারা রাজনৈতিক নেতাদের পুরস্কৃত করে এমন প্রমাণ ততটা স্পষ্ট নয়।
তবুও ট্রাম্প কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, ভেনেজুয়েলায় তার তথাকথিত 'আইন-শৃঙ্খলা অভিযান' আসলে মাদক দমনের চেয়ে তেলের বিষয়টিতেই বেশি কেন্দ্রীভূত। তিনি চান ভেনেজুয়েলা দ্রুত তেল উৎপাদন বাড়াক, যাতে বৈশ্বিক সরবরাহ বেড়ে যায় এবং তেলের দাম কমে। এতে মুদ্রাস্ফীতিও কিছুটা কমতে পারে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ ডলারে নামাতে চান। কিন্তু সমস্যাটি হলো, এই দাম অধিকাংশ মার্কিন তেল কোম্পানির জন্য ব্রেক-ইভেনের অনেক নিচে। বর্তমানে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডাব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম প্রায় ৫৯ ডলার। গত জুনে তা ছিল প্রায় ৭৩.৮০ ডলার। সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার বা তার বেশি হলে কোম্পানিগুলো ভালো চলে। কিন্তু দাম ৬০ ডলারের নিচে নামলে তারা চাপে পড়ে।
কিছু পুরোনো কূপে তুলনামূলক কম খরচে তেল তোলা যায়। তবে দাম দীর্ঘদিন কম থাকলে উৎপাদন বাড়বে না, বরং অনেক রিগ বন্ধ হয়ে যাবে।
ফরচুন ম্যাগাজিন লিখেছে, 'জ্বালানি বিশ্লেষকরা ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারকে সেই সীমারেখা মনে করেন, যেখানে উৎপাদকরা কার্যক্রম কমাতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত উৎপাদন হ্রাস করেন।' রেমন্ড জেমসের জ্বালানি খাতপ্রধান মার্শাল অ্যাডকিন্স বলেন, '৬০ ডলারে যুক্তরাষ্ট্র ধীর হয়ে যাবে… তবে সেটা রাতারাতি হবে না।
এর মানে এই নয় যে তেলের দাম শুধু কমবেই বা বাড়বেই দুটোই হতে পারে। তেল বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির দামের পণ্যের একটি। আবহাওয়া, বৈশ্বিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অবস্থা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ও দামে প্রভাব ফেলে।
কোভিড মহামারির সময় কী হয়েছিল মনে আছে? লকডাউনে মানুষ চলাচল বন্ধ করেছিল, তেলের চাহিদা কমে যায়, মজুত বেড়ে যায়, আর দাম নেমে আসে। ২০২০ সালের এপ্রিলে ব্যারেলপ্রতি দাম নেমেছিল প্রায় ১৭ ডলারে। তখন কোম্পানিগুলো কূপ বন্ধ করে দেয়। এক বছর পর দাম আবার ৬০ ডলারে ওঠে এবং পরে আরও বাড়ে, কারণ উৎপাদন সীমিত রাখা হয়েছিল। এমনকি বাইডেন অনুরোধ করার পরও কোম্পানিগুলো উৎপাদন বাড়ায়নি, কারণ তারা জানত রাজনৈতিক চাপ কমলে আবার জলবায়ু ইস্যুতে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হবে।
ভেনেজুয়েলাও বড় ঝুঁকির জায়গা। রাজনৈতিকভাবে দেশটি বিপজ্জনক। ট্রাম্প মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সশস্ত্র ‘কোলেকতিভো’ গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষমতায় রেখেছেন। ফলে ভেনেজুয়েলা একটি অস্থির আগ্নেয়গিরির মতো। এমনকি মার্কিন সরকার নিজ নাগরিকদের দেশ ছাড়তে বলছে। কোনো দায়িত্বশীল সিইও এমন পরিবেশে হাজার হাজার কর্মী পাঠাবেন না।
অর্থনৈতিক সমস্যাও গুরুতর। তেল কোম্পানির প্রধানরা জানেন, হুগো শাভেজ ও মাদুরোর জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক নীতিতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠনে বহু বছর ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লাগবে।
ধরেও নিলে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব (যা বাস্তবে নয়), তবুও বিশ্ববাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম আরও কমবে এবং দীর্ঘদিন কম থাকতে পারে। ট্রাম্পের প্রস্তাবের মানে দাঁড়ায়: 'বেশি খরচ করো, কম লাভ করো।'
এই কারণেই এক্সনমোবিলের সিইও ড্যারেন উডস বলেছেন, বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও আইনি সংস্কার ছাড়া ভেনেজুয়েলা 'বিনিয়োগযোগ্য' নয়।
এই মন্তব্যের পর ট্রাম্প বলেন, তিনি এক্সনমোবিলকে ভেনেজুয়েলা প্রকল্প থেকে বাদ দিতে পারেন যা শাস্তি নয়, বরং উপকারই হবে।
ট্রাম্প দাবি করছেন, কোম্পানিগুলো ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। বাস্তবে তা কেউ বিশ্বাস করে না। সংক্ষেপে বললে, তিনি চান তেল কোম্পানিগুলো ক্ষতিতে যাক, যাতে তিনি নির্বাচনে জিততে পারেন। সেটা অন্তত নভেম্বরের আগে ঘটবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
এই কারণেই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও নীতিকৌশলে জ্বালানি তেলের বিষয়টি কেন্দ্রে চলে এসেছে। তিনি জানেন, সীমান্ত, আদালত বা পররাষ্ট্রনীতির চেয়ে অনেক ভোটারের কাছে গ্যাসের দাম বেশি “বাস্তব” ইস্যু। কারণ এটি প্রতিদিন চোখের সামনে, পকেটের ভেতর, এবং মানসিক চাপে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
কিন্তু সমস্যাটি হলো, জ্বালানি বাজার কোনো দেশের একক নিয়ন্ত্রণে নেই। যুদ্ধ, বৈশ্বিক চাহিদা, আবহাওয়া, উৎপাদন সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে তেলের দাম ওঠানামা করে। একজন প্রেসিডেন্ট চাইলেই এটি স্থায়ীভাবে বেঁধে রাখতে পারেন না। তবু রাজনীতিতে “ধারণা” অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী। মানুষ যদি মনে করে, সরকার দাম কমাতে পারছে না বা চায় না তবে শাস্তি আসে ভোটে।
ট্রাম্পের বক্তব্য তাই কেবল রাজনৈতিক বুলি নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটার মনস্তত্ত্বের একটি স্বীকারোক্তি। গ্যাসের দাম এখানে শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয় এটি হয়ে উঠেছে সরকারের সক্ষমতার প্রতীক।
এ কারণেই বলা যায়, আমেরিকার রাজনীতিতে অনেক যুদ্ধ শুরু হয় দূরদেশে, কিন্তু অনেক সরকার দুর্বল হয় কাছের গ্যাস স্টেশনে।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি