গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পীয় কায়দায় 'আগুনে ঘি ঢালছে' ভুয়া মিডিয়া
ছাবেদ সাথী
সত্যি বলতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্কের চেয়ে নিখুঁত জোট আর হয় না। তারা একে অপরের জন্যই বাঁচে।
ট্রাম্প চান সংবাদমাধ্যমের অবিভক্ত মনোযোগ, আর সংবাদমাধ্যম চায় ট্রাম্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া চাঞ্চল্যকর কনটেন্টের অবিরাম জোগান। সাংবাদিক ও সম্পাদকীয় বোর্ডগুলোর বিরোধিতামূলক কথাবার্তা সত্ত্বেও, প্রেসিডেন্ট ও প্রেস আসলে স্বর্গে গড়া এক জুটি।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, ডেনমার্কের মালিকানাধীন (এবং ন্যাটোর সদস্য) গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আগ্রহকে কেন্দ্র করে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া নিয়ে যে 'আগুনে ঘি ঢালা' ধরনের সংবাদ কাভারেজ চলছে। এই কাভারেজের সুর ও ভঙ্গি একেবারেই ট্রাম্পীয়।
যুক্তরাজ্যের টেলিগ্রাফ পত্রিকার এক ভয়ংকর শিরোনাম ছিল: 'গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ‘আগে গুলি করবে, পরে প্রশ্ন করবে’।
এই 'আগে গুলি' নীতির উৎপত্তি ১৯৫০-এর দশকে, ঠান্ডা যুদ্ধের সময়। তখন থেকেই এটি কার্যকর আছে। মানুষ এখন হঠাৎ করে কয়েক দশক পুরোনো একটি নীতি আবিষ্কার করছে এবং এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বানানো।
এই সপ্তাহে সিএনএন জানিয়েছে, 'গ্রিনল্যান্ড সংযুক্ত করার হুমকি বাড়ায় ইউরোপীয় দেশগুলো সেখানে অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছে।'
রয়টার্স লিখেছে, 'আলোচনা সত্ত্বেও দ্বীপটি নিয়ে ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অটল থাকায় ইউরোপীয় সামরিক বাহিনী গ্রিনল্যান্ডের দিকে যাচ্ছে।'
এই সব পড়ে মনে হতে পারে, আমরা বুঝি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকেই এগোচ্ছি এবং ন্যাটো ভেঙে পড়তে চলেছে—গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সেনাবাহিনী জড়ো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য।

আপনি যদি সেটাই আশা করেন, তবে বলব এবার বাস্তবতায় ফিরুন। আমরা এখনো ‘তলোয়ার ঝনঝনানি’ পর্যায়েও যাইনি, যুদ্ধ তো দূরের কথা। আমরা এখনও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে দরকষাকষির পর্যায়েই আছি। হোয়াইট হাউস তা জানে। ডেনমার্কও জানে।
ফ্রান্স গ্রিনল্যান্ডে সবচেয়ে বড় বাহিনী পাঠিয়েছে প্রায় ১৫ জন পাহাড়ি পদাতিক বিশেষজ্ঞ। জার্মানি পাঠিয়েছে মোট ১৩ জন—একটি নজরদারি দল। নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড পাঠিয়েছে দুজন করে সংযোগ কর্মকর্তা। সুইডেন পাঠিয়েছে তিন থেকে পাঁচজন কর্মকর্তা। নেদারল্যান্ডস পাঠিয়েছে একজন নৌ কর্মকর্তা, আর যুক্তরাজ্যও পাঠিয়েছে একজন কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, ডেনমার্কের সঙ্গে ১৯৫১ সালের চুক্তির আওতায় পরিচালিত পিটুফিক স্পেস বেসে বর্তমানে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
ন্যায্যভাবে বলতে গেলে, ট্রাম্প যখন বলেন প্রয়োজনে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আর্কটিকের এই দ্বীপটি দখল করবেন, তখন তিনি আদৌ মজা করছেন নাকি না তা বোঝাই কঠিন। এই মানুষটির ক্ষেত্রে কে-ই বা নিশ্চিত?
ট্রাম্পের বক্তব্য হুবহু তুলে ধরার জন্য সংবাদমাধ্যমকে দোষ দেওয়া যায় না, কারণ তাতে মনে হতে পারে তিনি সত্যিই ন্যাটো-সুরক্ষিত একটি দেশের ওপর সামরিক হামলার কথা ভাবছেন। কিন্তু ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড পাওয়ার রুক্ষ কৌশলের জবাবে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া নিয়ে যে অতিরঞ্জিত, আতঙ্কগ্রস্ত কাভারেজ চলছে তার জন্য সংবাদমাধ্যমকে অবশ্যই দোষ দেওয়া যায়।
ইউরোপ, যার মধ্যে এক ধরনের তীব্র হীনম্মন্যতা কাজ করে, তবু নিজেকে তুলনামূলকভাবে বেশি পরিণত ও পরিশীলিত মনে করে। তারা ট্রাম্পের প্রস্তাবের জবাবে জাতীয়তাবাদী দম্ভ দেখাচ্ছে ইউরোপীয় শক্তি ও সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকারের বুলি আওড়াচ্ছে। বিষয়টি বেশ মিষ্টিই লাগে, কারণ গত কয়েক দশক ধরে ইউরোপের জাতীয় প্রতিরক্ষা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপরই নির্ভরশীল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিছু ইউরোপীয় ন্যাটো দেশ গ্রিনল্যান্ডে প্রতীকী কয়েকজন সেনা পাঠিয়েছে সংহতির নিদর্শন হিসেবেএকটি এমন দেশের বিরুদ্ধে, যার নৌবাহিনীর বাজেটই অন্তত ছয়টি ন্যাটো দেশের সম্মিলিত বার্ষিক জিডিপির চেয়েও বেশি।
এখানে 'প্রতীকী' শব্দটাই আসল। কারণ এই মোতায়েনগুলো আসলে তাই মাত্র তিন-চার ডজন ইউরোপীয় সৈন্য ও কর্মকর্তা, ডেনমার্কের মালিকানা পুনর্ব্যক্ত করতে গ্রিনল্যান্ডে পাঠানো। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো দেখানো যে দ্বীপটি ন্যাটোর সুরক্ষার আওতায় পড়ে। (গ্রিনল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ধারা অনুযায়ী সুরক্ষিত কি না, তা ব্রাসেলসে এখনো বিতর্কের বিষয়।)
অর্থাৎ, ডেনমার্ক ও তার মহাদেশীয় বন্ধুরা একটু ‘শো’ দিচ্ছে। তারা একটি বার্তা দিচ্ছে, একটি দৃশ্য তৈরি করছে। তারা ভঙ্গি করছে।
কিন্তু তারা যা করছে না, তা হলো গ্রিনল্যান্ডে সত্যিকারের সামরিক শক্তি গড়ে তোলা বা আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া। এমনকি তারা প্রকৃত অর্থে কোনো “ট্রিপওয়্যার” পরিস্থিতিও তৈরি করছে না, যার বাস্তব পরিণতি থাকতে পারে।
এই দেশগুলোর কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সশস্ত্র বা এমনকি অর্থনৈতিক সংঘাতের কথাও বাস্তবে ভাববে না। এভাবে বলি: যে ইউরোপীয় ন্যাটো দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডে দ্রুত 'বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড' পাঠিয়েছে, তারা রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা করতে একটি সৈন্যও পাঠায়নি। প্রায় চার বছর ধরে তারা দেখছে রাশিয়া তাদেরই মহাদেশে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাস্তব যুদ্ধে, বাস্তব গুলি ও বাস্তব প্রাণহানিতে। তারা একটি সৈন্যও পাঠায়নি, এই যুক্তিতে যে তাতে সংঘাত আরও বাড়বে। তাছাড়া ইউরোপ এখনো রাশিয়ান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
তবু আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে, এই একই দেশগুলো গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে দেশটিও ন্যাটোর সদস্য অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত? একটি ভূখণ্ডের জন্য, যা ১৯৭৯ সাল থেকে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছে? আমরা বিশ্বাস করব, তারা আলোচনা ও কূটনীতি বাদ দিয়ে সরাসরি বিশ্বের শীর্ষ পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে শুধু কিছু বক্তব্যের কারণে?
আরে, একটু থামুন।
এই মোতায়েনগুলো দরকষাকষির কৌশল। ডেনমার্ক ও তার বন্ধুরা একটি নাটক মঞ্চস্থ করছে, যার উদ্দেশ্য গ্রিনল্যান্ডের দাম বাড়ানো। এই কথায় ভরসা রাখুন।
সংবাদমাধ্যমের সদস্যরা হয়তো বুঝতে পারছেন না ডেনমার্ক আসলে কী করছে। কিন্তু আমার ধারণা, একজন নির্দিষ্ট মার্কিন রিয়েল এস্টেট মোগল তা ভালোভাবেই বোঝেন।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি