চুল পড়া বন্ধে করণীয় জানালেন ডা. তাসনিম জারা
তাসনিম জারা।
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: চিকিৎসা জগতে ও নেটিজেনদের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত এবং আলোচিত নাম ডা. তাসনিম জারা। তিনি একাধারে একজন চিকিৎসক, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং রাজনৈতিক নেত্রী। তাসনিম জারা ‘সহায় হেলথ’ নামক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এর মাধ্যমে তিনি সুদূর প্রবাসে থেকেও বাংলাভাষী জনগণের জন্য প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা তথ্য প্রদান করে যাচ্ছেন।
চুলের যত্ন নেওয়ার সঠিক উপায় ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
চুল পড়া বন্ধের ১০টি সেরা খাবার
বাদাম
যেমন: চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম, ওয়ালনাট। এগুলোতে আছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, বিশেষ করে ওমেগা-৬ ফ্যাট, যা চুলের গোড়া সতেজ রাখতে আর চুল লম্বা করতে সাহায্য করে। এই ওমেগা-৬ ফ্যাট আমাদের শরীর নিজে থেকে তৈরি করতে পারে না, খাবার থেকে নিতে হয়। এটার অভাবে মাথার চুল পড়ে যায়, চুলের রঙ হালকা হয়ে যায়।
তাই প্রতিদিনের নাস্তায় কিছু বাদাম রাখতে পারেন। তবে অনেক পরিমাণে খাবেন না, তাহলে ওজন বেড়ে যেতে পারে।
হলুদ আর কমলা রঙের সবজি এবং ফল
যেমন: মিষ্টি আলু, গাজর, আম, পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া। এগুলো ভিটামিন এ-তে ভরপুর। চুলের ফলিকল, অর্থাৎ চুলের গোড়া যেখান থেকে চুলটা বড় হয়, সেটা ঠিকমতো কাজ করার জন্য দরকার ভিটামিন এ। আর সেটার খুব ভালো উৎস হলো এই হলুদ আর কমলা রঙের ফল এবং সবজি।
দিনে যতখানি ভিটামিন এ দরকার, আধা কাপ গাজরে তার অর্ধেকের বেশি হয়ে যায়। তাই দিনে কিছু হলুদ ফল বা সবজি খাওয়ার চেষ্টা করবেন।
তৈলাক্ত মাছ
প্রচলিত একটা ধারণা আছে যে ওমেগা-৩ ফ্যাটের জন্য সামুদ্রিক মাছই খেতে হবে। যেমন: টুনা, স্যামন। তবে আমাদের দেশি মাছ, যেমন: ইলিশ, কই, মলা, চাপিলা এগুলোতেও ওমেগা-৩ ফ্যাট আছে। এগুলো চুল ঘন কালো করতে সাহায্য করে, সাথে প্রোটিনেরও ভালো উৎস।
ডিম
সুন্দর চুলের জন্য ডিম আপনার খুব ভালো বন্ধু। কেন বুঝিয়ে বলি। আমাদের চুল শর্করা বা ফ্যাটের তৈরি না, চুল প্রায় পুরোটাই প্রোটিনের তৈরি। আর আমরা গবেষণা থেকে নিশ্চিত জানি যে খাবারের প্রোটিনের অভাব হলে চুল পড়ে যায়। কিন্তু আমাদের অনেকের খাবারেই যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটিন থাকে না, কারণ আমরা সাধারণত ভাতটাই বেশি খাই।
তাই সুন্দর চুলের জন্য খাবারের তালিকায় ডিম রাখবেন। সঙ্গে ডিমে আরও কিছু বোনাস আছে। যেমন: বায়োটিন, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি১২ ইত্যাদি। এগুলো চুল ঘন, কালো আর সুন্দর রাখতে সাহায্য করে।
পালং শাক
চুলের উপকারে পালং শাক একটা চমৎকার খাবার। এতে চারটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে যা চুলের ভেতর থেকে পুষ্টি জোগায় – ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, আয়রন, ফোলেট। এই সবগুলোই ঘন, কালো, সুন্দর চুলের জন্য প্রয়োজন।
ডাল
সুন্দর চুলের জন্য ডাল খুব উপকারী। ডালে প্রোটিন আছে, ভালো পরিমাণে আয়রন আছে। আয়রন আমাদের মাথার তালুতে রক্ত সরবরাহ করে চুলের গোড়ায় অক্সিজেন পৌঁছাতে সাহায্য করে। আমরা গবেষণা থেকে নিশ্চিত জানি যে আয়রনের অভাবে চুল পড়ে। সুন্দর চুলের জন্য ডালে আরও কিছু বোনাস আছে। যেমন: জিঙ্ক, ফোলেট। খুব পাতলা ডাল না খেয়ে ঘন করে রান্না ডাল খেলে এই পুষ্টি উপাদানগুলো বেশি করে পাবেন।
বিভিন্ন ধরনের বীজ
যেমন: চিয়া সিডস, মিষ্টি কুমড়ার বিচি, সূর্যমুখীর বিচি, তিসির বীজ। এগুলোতে সুন্দর চুলের জন্য অনেকগুলো চমৎকার উপাদান আছে। যেমন: চিয়া সিডসে আছে প্রচুর পরিমাণে আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড, এক প্রকারের ওমেগা-৩ ফ্যাট। মিষ্টি কুমড়ার বিচিতে আছে জিঙ্ক। সূর্যমুখীর বিচিতে আছে বায়োটিন। তিসির বীজে আছে সেলেনিয়াম। গবেষণায় চুল পড়ার সাথে এগুলোর অভাবের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সিডস কীভাবে খেতে পারেন?
ভাত খাওয়ার সময় তরকারির ওপরে একটু বীজ ছিটিয়ে দিতে পারেন। রাতে টক দই, অল্প দুধের সাথে চিয়া সিডস মাখিয়ে ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন। সকালে কিছু ফলের সাথে খেয়ে নিলেন।
ছোলা
ছোলায় চুলের জন্য তিনটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আছে – আয়রন, জিঙ্ক এবং প্রোটিন। এই তিনটার যেকোনোটার অভাবে চুল পড়তে পারে। তাই চুল সুন্দর করতে মাঝেমধ্যেই খাবারে ছোলা রাখতে পারেন।
টক দই
এটা প্রোটিনের আরেকটা উৎস। সাথে চুলের জন্য উপকারী আরও কিছু উপাদান আছে, যেমন জিঙ্ক। প্রোটিনের জন্য মুরগির মাংসও ভালো খাবার।
টক ফল
যেমন: কমলা, মাল্টা, লেবু, কিউই ফল। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি আছে। সুন্দর চুলের জন্য ভিটামিন সি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন সি-এর অভাবে চুল এমন বেঁকিয়ে পেঁচিয়ে যায়। মেডিকেলের ভাষায় এটাকে বলে কর্কস্ক্রু হেয়ার। আবার ভিটামিন সি-এর অভাব হলে শরীর আয়রন শোষণ করতে পারে না, ফলে চুল পড়ে যায়।
আমাদের শরীর নিজে থেকে ভিটামিন সি বানাতে পারে না, তবে টক জাতীয় ফল খেলে সহজেই সেখান থেকে ভিটামিন সি নিয়ে নিতে পারে। যেমন: একটা কমলা থেকেই দিনের প্রায় ৮০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। যারা টক একটু কম খেতে পারেন, তাদের জন্য টমেটো, পেয়ারা এই ফলগুলো ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস হতে পারে।
এই দশ প্রকারের খাবার ভেতর থেকে চুলে পুষ্টি দিবে। এখন বলব বাইরে থেকে পুষ্টি দেয়ার জন্য কী ব্যবহার করতে পারেন।
যেসব জিনিস বাহির থেকে চুলে পুষ্টি জোগায়
পাম্পকিন সিড অয়েল বা কদুর তেল
চুল পড়ে যাচ্ছে এমন রোগীদের ওপর করা একটা গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই তেলটা তিন মাস ব্যবহার করার পরে তাদের নতুন করে চুল গজিয়েছে আর চুল আগের থেকে মোটা হয়েছে। তাই কদুর তেল ব্যবহার করে দেখতে পারেন।
কদুর তেল
কদুর তেলটা ব্যবহার করতে পারেন। যে কোনো ব্র্যান্ডের কদুর তেল ব্যবহার করতে পারেন, তাতে চুল পড়া ঠেকাতে সাহায্য হতে পারে।
এখন আসি চুল পড়া ঠেকাতে কোন ভিটামিন ট্যাবলেট কার্যকর। বাজারে অনেক ধরনের ভিটামিন ট্যাবলেট বিক্রি হয়। অনেক চমকপ্রদ কথাবার্তা লেখা থাকে সেগুলোতে। তবে এর বেশিরভাগেরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, অযথা টাকার অপচয়। চুলের জন্য বেশিরভাগ পুষ্টি উপাদান আলাদা ট্যাবলেটের চেয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার থেকে আসলেই ভালো হয়।
চুলের যত্নে ভিটামিন ডি
তবে এই ক্ষেত্রে একটা ব্যতিক্রম আছে, সেটা হলো ভিটামিন ডি। খাবার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি পাওয়া খুব কঠিন। ভিটামিন ডি পাওয়ার সহজ উপায় হলো রোদে সময় কাটানো। কিন্তু যাদের পক্ষে এইটা সম্ভব না, তারা আলাদা করে ভিটামিন ডি ট্যাবলেট খেতে পারেন।
ভিটামিন ট্যাবলেটের ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকবেন। কারণ অতিরিক্ত ট্যাবলেট নিলেও চুল পড়তে পারে। যেমন: অতিরিক্ত ভিটামিন এ ট্যাবলেটের ফলে চুল পড়ে যায়। কিন্তু আপনি হলুদ রঙের সবজি খেয়ে শরীরে যতই ভিটামিন এ ঢোকান না কেন, তাতে ক্ষতি নাই।
চুলের যত্নে কিছু কমন ভুল
১. অনেকে শ্যাম্পু ব্যবহারের পরে কন্ডিশনার ব্যবহার করেন না। এটা চুলের জন্য ক্ষতিকর। কারণটা বুঝিয়ে বলি। আমাদের চুল ভালো থাকার জন্য কিছু তেল দরকার হয় যা মাথার তালু থেকে এমনিতেই আসে। কিন্তু আমরা যখন শ্যাম্পু ব্যবহার করে চুল ধুই, তখন সেই তেলটাও ধুয়ে চলে যায়। কন্ডিশনারের কাজ হচ্ছে তেলগুলো আবার চুলে ফেরত দেয়া। তাই প্রতিবার শ্যাম্পু করার পরে চুলে কন্ডিশনার লাগাবেন।
২. ভেজা চুল ঘষে ঘষে মুছবেন না। আমরা অনেকেই গোসল করে তোয়ালে দিয়ে একদম ঘষে ঘষে চুল মুছি, এতে চুল নষ্ট হয়। এমন না করে তোয়ালে দিয়ে আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে দিয়ে পানি বের করবেন।
৩. ভেজা চুল আঁচড়াবেন না। এতে চুল নষ্ট হয়। চুল খুব কোঁকড়া না হলে একটু শুকিয়ে যাবার পর চওড়া দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াবেন।
৪. ব্লো ড্রায়ার বা কার্লিং আয়রন দিয়ে চুল শুকাবেন না। চুল বাতাসে শুকিয়ে নেয়া সবচেয়ে ভালো। তবে যদি ব্লো ড্রায়ার বা কার্লিং আয়রন ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে সবচেয়ে কম হিটে ব্যবহার করবেন, যত অল্প সময় ধরে করা যায়। সপ্তাহে একবারের বেশি ব্যবহার না করার চেষ্টা করবেন।
৫. খুব টাইট করে চুল বাঁধবেন না। যারা খুব টাইট করে চুল বেঁধে রাখেন, সেই টানের কারণে চুল পড়তে পারে। এটাকে বলে ট্র্যাকশন অ্যালোপেসিয়া।
চুল পড়ার চিকিৎসা
কিছু রোগের কারণে চুল পড়তে পারে। যেমন: থাইরয়েডের রোগ, রক্তশূন্যতা। আপনার যদি খাবার-দাবার ঠিক থাকে, চুলের যত্ন নিচ্ছেন ঠিকমতো, তাও অনেক চুল পড়ে, তাহলে একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। তিনি খতিয়ে দেখতে পারবেন কোনো রোগের কারণে এমন হচ্ছে কিনা। রোগ ধরা পড়লে সে অনুযায়ী চিকিৎসা করা যাবে।
চুল পড়তে থাকার একটা অন্যতম কারণ হলো Androgenetic Alopecia নামের একটা রোগ। এই রোগে ছেলেদের মাথায় সাধারণত টাক পড়া শুরু করে, কপালের দুই পাশ থেকে চুল টাক হতে পারে। মেয়েদের সাধারণত টাক হয় না, কিন্তু চুল পাতলা হয়ে যায়, মাথার সিঁথি বড় হয়ে যায়।
এই দুই ক্ষেত্রেই চিকিৎসা আছে। দুটা ওষুধ খুব ভালো কাজ করে। ওষুধগুলোর নাম হলো Minoxidil আর Finasteride। চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন। তিনি দেখতে পারবেন আপনার এই রোগটা হয়েছে কিনা এবং কোন ওষুধে ভালো হতে পারে।
ওষুধ ছাড়াও আরও কিছু উন্নত চিকিৎসা দেশে হচ্ছে। যেমন: হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট অর্থাৎ মাথার পেছন থেকে চুল এনে সামনে বসানো। তারপর পিআরপি থেরাপিতেও কেউ কেউ উপকার পাচ্ছেন। অর্থাৎ চুল পড়ার অনেক ধরনের চিকিৎসা আছে। একজন ডার্মাটোলজিস্ট বা স্কিনের ডাক্তারের কাছে গেলে তারা চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন। সূত্র: যুগান্তর
বিপি>টিডি
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি