চোখের সামনে ঘটছে যা, সেটাই সত্য
অ্যালেক্স জেফ্রি প্রেটি
ছাবেদ সাথী
রাষ্ট্র যখন বলে 'আমাদের বিশ্বাস করুন'
আর ক্যামেরা যখন বলে চোখে দেখুন'
এই দুইয়ের মধ্যে আজ আমেরিকার নৈতিক ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে আছে।
মিনিয়াপোলিসে তোলা একটি ছবি একজন মানুষ উপুড় হয়ে মাটিতে, তাঁর ওপর চেপে বসা দুই এজেন্ট, আর তৃতীয় একজন তাঁর মুখে পেপার স্প্রে ঢালছে এই ছবি আর শুধু ছবি নয়। এটি একটি দলিল। এটি রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের নগ্ন স্বীকারোক্তি।
তারপর আসে ভিডিও। পাঁচ বছরের শিশুকে আটক। এক কিশোরকে তাড়া। আর সর্বশেষ নার্স আলেক্স প্রেটি। পেপার স্প্রে। ধাক্কা। অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার দৃশ্য। তারপর গুলির পর গুলি মাটিতে পড়ে থাকা দেহে।
এই মৃত্যুকে হোয়াইট হাউস বলছে 'আত্মরক্ষা।' বলছে 'সম্ভাব্য আততায়ী।'
ভিডিও বলছে মিথ্যা।
এই যুগে আর দমন শুধু লাঠি বা বন্দুক দিয়ে হয় না। হয় গল্প দিয়ে। হয় ভিডিও বানিয়ে। হয় ছবি বিকৃত করে। প্রশাসন চায় এমন ফুটেজ, যা তাদের ভাষ্যকে মানায়। আর যেটা মানায় না, সেটাকে বদলে ফেলা হয়।

কিন্তু মিনিয়াপোলিসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা গল্প বানাচ্ছেন না। তাঁরা শুধু ক্যামেরা ধরছেন। গুলি চলার সময়ও। চিৎকারের মাঝেও। কারণ তাঁরা জানেন প্রমাণ না থাকলে সত্য মারা যায়।
আলেক্স প্রেটি শুধু গুলিতে মারা যাননি। তিনি মারা গেছেন সত্য ধারণ করতে গিয়ে।
আর তাঁর মৃত্যুর ভিডিও আজ একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- রাষ্ট্রের কথা বিশ্বাস করবেন, নাকি নিজের চোখ?
মিনিয়াপোলিসে তোলা রিচার্ড সঙ-টাটারির একটি ছবি ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। ছবিতে দেখা যায় এক অচেনা প্রতিবাদকারী উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন, দুজন বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট তাঁর ওপর চেপে ধরে রেখেছে, আর তৃতীয় একজন কয়েক ইঞ্চি দূর থেকে তাঁর মুখে পেপার স্প্রে ছিটাচ্ছে। শুক্রবার মিনেসোটা স্টার ট্রিবিউন-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত এই ছবি মিনিয়াপোলিসে আইসিইর (আইসিই) চলমান অভিযানের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছে।
এই একটি ছবিই নয় শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন আরও দৃশ্য। পাঁচ বছরের এক শিশুকে বাড়ির সামনে থেকে আটকের ছবি। তুষারের মধ্যে এক কিশোরকে ধাওয়ার ভিডিও, যেখানে সে স্প্যানিশে চিৎকার করে বলছে, 'আমি বৈধ।' আর সর্বশেষ ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স হাসপাতালের আইসিইউ নার্স আলেক্স প্রেটির মৃত্যু। ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁকে পেপার স্প্রে করা হচ্ছে, মাটিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে এবং উপুড় হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় তাঁর শরীরে একের পর এক গুলি চালানো হচ্ছে।
এই ঘটনার অনেক দিক এখনও তদন্তাধীন। কিন্তু মৌলিক সত্যগুলো অস্বীকার করা যায় না। প্রেটি একজন নারীকে সাহায্য করছিলেন, তাঁর হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। গত ১৮ দিনে মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টরা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে এবং হত্যা করেছে দুজনকে প্রথমে রেনি গুড, এরপর প্রেটি।
এই সহিংসতার কথা আমরা জানছি কারণ সাধারণ নাগরিকেরা ঝুঁকি নিয়ে ক্যামেরা চালু রেখেছেন। সঙ-টাটারি জানিয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবী পর্যবেক্ষকেরা সিগন্যাল গ্রুপের মাধ্যমে এজেন্টদের গতিবিধি নজরে রাখছেন, যাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তা নথিভুক্ত করা যায়। এই নাগরিক নথিবদ্ধকরণই আজ রাষ্ট্রের ভাষ্যের বিপরীতে বাস্তবতার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল।
কারণ বাস্তবতা আর সরকারি বক্তব্যের মধ্যে ব্যবধান ভয়াবহ। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দাবি করেছে, প্রেটি নাকি 'গণহত্যা চালাতে চেয়েছিলেন।' হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তা তাঁকে বলেছেন 'সম্ভাব্য আততায়ী।' অথচ ভিডিওতে দেখা যায় তাঁর হাতে ছিল একটি ফোন, বন্দুক নয়। তাঁকে গুলি করা হয়েছে মাটিতে পড়ে থাকার পর।
মিনিয়াপোলিসে এখন শুধু রাস্তায় সংঘাত নয়, চলছে তথ্যযুদ্ধ। প্রশাসন আইসিইকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও বানাতে বলছে। প্রেসিডেন্ট নিজে নাম, মুখ, সংখ্যা 'দেখাতে' নির্দেশ দিচ্ছেন। আর যখন বাস্তবতা তাঁদের পক্ষে যায় না, তখন ছবি বিকৃত করতেও দ্বিধা করা হচ্ছে।
এই যুগের নির্মম বিড়ম্বনা হলো-প্রমাণের অভাব নেই, তবু মিথ্যাই সবচেয়ে সংগঠিত। তবুও প্রেটির মৃত্যুর ভিডিও সেই কোলাহলের ভেতর দিয়েও মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। কারণ দৃশ্যগুলো খুব স্পষ্ট।
মিনিয়াপোলিসের মানুষ নিজেদের শহরের সত্য নথিবদ্ধ করতে গিয়ে জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন। প্রেটির ক্ষেত্রে সেই মূল্য দিতে হয়েছে প্রাণ দিয়ে। তাই আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন একটিই কথা মনে রাখুন 'চোখকে বিশ্বাস করুন'।
ইতিহাস আমাদের শেখায়—যেদিন মানুষ চোখের দেখা অস্বীকার করে, সেদিনই ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য হয়।
তাই এই মুহূর্তে নৈতিক অবস্থান খুব সরল—চোখকে বিশ্বাস করুন। ক্যামেরাকে বিশ্বাস করুন। আর যারা সত্য ধারণ করছে, তাদের পাশে দাঁড়ান।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি