৮ মে ২০২৬

বড়দিন: পৃথিবী থেকে দূর হোক হিংসা ও সাম্প্রদায়িকতা

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৩৯ পিএম
বড়দিন: পৃথিবী থেকে দূর হোক হিংসা ও সাম্প্রদায়িকতা
নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ শুভ বড়দিন। আজ থেকে দুই সহস্রাধিক বছর আগে খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক মহামানব যিশুখ্রিস্ট জেরুজালেমের কাছাকাছি বেথলেহেম নগরীর এক গোয়ালঘরে জন্মেছিলেন। বিশ্বের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা উৎসবমুখর পরিবেশে দিবসটি পালন করে থাকেন। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বের খ্রিস্ট বিশ্বাসীদের সঙ্গে বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও ধর্মীয় অনুভূতির পরম মমতায় আনন্দঘন পরিবেশে উৎসব পালন করে থাকে। দিনটি উপলক্ষে যিশুখ্রিস্টের জন্মের কাহিনী পাঠ ও ধ্যান করা হয়। সেই কাহিনী অবলম্বনে গির্জাঘরে, এমনকি প্রত্যেক বাড়িতে গোশালা নির্মাণ করে ফুলপাতা দিয়ে সাজানো হয়। এই দিনের কর্মসূচি শুধু আনন্দ-উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, যিশুর শান্তির বাণীও ছড়িয়ে দেওয়া যিশু সারা জীবন আর্তমানবতার সেবা, ত্যাগ ও শান্তির আদর্শ প্রচার করেছেন। পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের আলোর পথ দেখিয়েছেন। একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে তিনি হিংসা ও বিদ্বেষ ভুলে সবাইকে শান্তি, সম্প্রীতি, মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।পাপাচারে ডুবে থাকা মানুষকে সুপথে আনার জন্যই যিশু এসেছিলেন। যিশুর জন্মদিন তাই শুধু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই তাৎপর্য বহন করে। ৩৩ বছরের স্বল্পস্থায়ী জীবনে তিনি মানুষকে শুনিয়েছেন শান্তির বাণী, ভালোবাসার কথা। হিংসা-দ্বেষ, পাপ-পংকিলতা থেকে মানুষকে মুক্ত করাও ছিল তার প্রবর্তিত ধর্মের অন্যতম মূল কথা। তার শান্তির বাণী শাশ্বত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য। মতবাদ প্রচারের সময় অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন যিশু। কিন্তু কোনো নির্যাতন-নিপীড়নই তাকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। মানুষকে জয় করার হাতিয়ার ছিল তার সংযম ও সহিষ্ণুতা। বর্তমান যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সংঘাতময় এ পৃথিবীতে যিশুর বাণী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যিশু বিশ্বাস করতেন ঈশ্বরের শক্তিতে। বাইবেলে বর্ণিত আছে-‘আমি সব মন্দ আত্মাকে তাড়াই ঈশ্বরের শক্তিতে এবং তোমরা যা আমার কাছ থেকে শোনো তা আমার নয় বরং সেসব কথা পিতার, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।’ বর্তমান বিশ্বের হিংসা ও পারস্পরিক অশ্রদ্ধাবোধ প্রকৃত অর্থে আত্মারই সংকট। মন্দ আত্মা মানুষকে তাড়িয়ে ফিরছে নেতিবাচকতার দিকে। মানুষের মধ্যে যিশু প্রস্তাবিত পরিশুদ্ধ আত্মার প্রতিস্থাপন ছাড়া এ সংকট থেকে মুক্তির উপায় নেই। যিশু সব মানুষের জন্য সমান সুযোগ দেয়ার কথাও শুনিয়েছেন। আধুনিক গণতন্ত্রের মর্মকথাও তা-ই। সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, শুধু খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের জীবন ও দর্শনেই যিশুর প্রভাব পড়েনি, পুরো মানবসভ্যতাই কিছু না কিছু মাত্রায় প্রভাবিত হয়েছে তার আদর্শ, নীতি ও বিশ্বাস দ্বারা। এর সঙ্গে গান-বাজনা, নাম-সংকীর্তন, ভোজন, আনন্দ-উল্লাস ইত্যাদি চলে। এসব বাহ্যিক উৎসব-আয়োজনের ঊর্ধ্বে খ্রিস্ট বিশ্বাসীরা তাদের হৃদয়-মন ও অন্তরাত্মাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে প্রয়াসী হন। তাদের এই আনন্দ-উৎসব যাতে নিছক আচারিক বা অনুষ্ঠানসর্বস্ব না হয় সেজন্য বড়দিনের পূর্ববর্তী চার সপ্তাহব্যাপী আগমনকাল হিসেবে পালনের ব্যবস্থা করেন। এ সময়ে খ্রিস্টভক্তরা ধ্যান-অনুধ্যান, মন পরীক্ষা, ব্যক্তিগত পাপ স্বীকার, সমবেত পুনর্মিলন বা ক্ষমা-অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষে মানুষে সম্পর্কের উন্নয়ন ও নবায়ন করতে সচেষ্ট হন। বড়দিনের উৎসবে মুসলমান সম্প্রদায়ও যোগ দিয়ে থাকে এবং আনন্দ ভাগ করে নেয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী অংশ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকে শহীদ হয়েছেন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও মুসলমান, খ্রিস্টান, হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলায় অংশ নিয়েছেন। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে, যিশু ঈশ্বরের পুত্র, জগতের সব মানুষের ত্রাণকর্তা। তিনি বঞ্চিত-লাঞ্ছিত মানুষকে দিয়েছেন বাঁচার অনুপ্রেরণা। তিনি মানবজাতিকে পাপ ও ঘৃণার পথ থেকে মমতা, ভালোবাসা ও ক্ষমাশীলতার পথে ফেরাতে চেয়েছিলেন। মানবসেবারও অন্যতম আদর্শ তিনি। তাই তিনি শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষ নিয়ে শাসকের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাই মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে জীবন দিতে হয়। এর মধ্য দিয়ে যিশু আত্মত্যাগেরও শিক্ষা দিয়ে গেছেন আমাদের। মানবজাতির নৈতিকতার বড় অধঃপতন হয়েছে। বেড়েছে লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ। এ কারণেই সারা বিশ্বে আজ এত হানাহানি, এত অশান্তি। শুভ বড়দিনে যিশুর বাণী এই দৈন্য ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার শক্তি জোগাতে পারে। প্রতিটি ধর্মেরই মূলকথা মানবতাবোধ। বড়দিন উপলক্ষে যে প্রেম ও আশার বাণী প্রচার করা হয়, তারও মূলে রয়েছে মানবতা। ধর্মকে কেন্দ্র করেই এই একবিংশ শতকেও কিছু মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘাত পরিলক্ষিত হয়। তাই বড়দিন হোক সব পথভ্রষ্ট মানুষের শুভবুদ্ধি উদয়েরও দিন। বড়দিন প্রত্যেক মানুষকে শান্তি, প্রেম ও সম্প্রীতির শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করুক। পৃথিবী থেকে দূর হোক হিংসা ও সাম্প্রদায়িকতা। বিদায় নিক বর্ণবাদের মতো নিকৃষ্ট সব চিন্তাধারা। যিশুর সংযম, সহিষ্ণুতা ও ভালোবাসার শিক্ষা হোক সবার পাথেয়। বড়দিন উপলক্ষে আমরা বাংলাদেশে অবস্থানরত খ্রিস্টানসহ পৃথিবীর সব খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে জানাই শুভেচ্ছা। বড়দিনের উৎসব সার্বজনীনতা লাভ করুক। এ ধর্মীয় উৎসবে সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সংহতি গড়ে উঠবে এবং তা বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। উৎসবের দিনে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। শুভ বড়দিন। বিপি।সিএস
[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি