বিয়ের পর নারীর নাকি পুরুষের বেশি অসন্তুষ্টি?
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: বিয়ে নিয়ে লোকমুখে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে—‘বিয়ের লাড্ডু যে খায়, সে পস্তায়; আর যে খায় না, সেও পস্তায়।’ কথাটি নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হলেও বাস্তবে পুরুষরাই এ কথা বেশি শোনেন বন্ধু কিংবা বিবাহিত আত্মীয়দের কাছ থেকে। তাদের বর্ণনায়, বিয়ের পর পুরুষের জীবনে নেমে আসে এক ধরনের অব্যক্ত অশান্তি। তবে এই দাবির সঙ্গে নারীরা সবসময় একমত নন। বরং অনেক নারীই মনে করেন, বিয়ের পর অসন্তুষ্টির পাল্লাটা তাদের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে। সূত্র: এবিডি পোস্ট
এই মতভেদের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণা। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ের পর বা সঙ্গীর সঙ্গে বসবাস শুরু করলে পুরুষেরা তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্টি অনুভব করেন, যেখানে নারীদের অভিজ্ঞতা অনেক সময় ভিন্ন। নারীদের ক্ষেত্রে সন্তুষ্টির চিত্রটি প্রায় উল্টো—সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের অসন্তুষ্টি বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
গবেষকদের মতে, নারী ও পুরুষের কাছে ‘সন্তুষ্টি’র অর্থ এবং তা অনুভব করার সময়কাল একেবারেই আলাদা হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বিয়ের সামাজিক মোহ, বয়সের ব্যবধান কিংবা প্রচলিত রীতিনীতির চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সম্পর্কের স্বচ্ছতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং একে অপরের প্রতি সম্মান। কারণ, সুখের সংজ্ঞা সবার জন্য এক নয়। তাই অন্ধ অনুকরণ বা সামাজিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে যেখানে নিজের ভালো লাগা ও মানসিক প্রশান্তি সবচেয়ে বেশি, সেখানেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে নেওয়াই বোধহয় সবচেয়ে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত।
বিয়ে নাকি বিয়ের পরিকল্পনা
‘বিয়ের পর সব সুখ ফুরিয়ে যায়’ বন্ধুমহলের এ রসিকতা কি তবে কেবল কৌতুক নয়; বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেলিন্ডা হিউইটের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় ১৮ বছর ধরে প্রায় ২ হাজার ৮২০ জন মানুষের জীবনযাপনের মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নজর রাখা হয়। ফলাফল বলছে, একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে সুখের সময় হলো যখন তিনি তার সঙ্গীর সঙ্গে প্রেম বা লিভ-ইনের সম্পর্কে রয়েছেন বা ভবিষ্যতে বিয়ের পরিকল্পনা করছেন। গবেষকদের মতে, বিয়ের আগের এ সময়টিতে একটি লক্ষ্য বা ‘প্রজেক্ট’ থাকে। বিয়ের আয়োজন, হানিমুন এবং সঙ্গীর প্রতিশ্রুতির এই আকাঙ্ক্ষা নারীকে একধরনের মানসিক পূর্ণতা দেয়। কিন্তু বিয়ের এক বছর পার হতে না হতেই এই সন্তুষ্টি ও সুখের মাত্রা কমতে শুরু করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তা বিয়ের আগের স্তরের চেয়েও নিচে নেমে যায়। এর কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলছেন, বিয়ের পর পরিকল্পনার সেই আগ্রহ শেষ হয়ে যায়। আর সে জায়গা দখল করে সামাজিক প্রত্যাশা ও নানামুখী পারিবারিক চাপ।
সুখের ভিন্ন রূপ
গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ের পর বা সঙ্গীর সঙ্গে থাকতে শুরু করলে পুরুষেরা সবচেয়ে বেশি সুখী থাকেন। তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থার কোনো বিশেষ পরিবর্তন না হলেও মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের পর সম্পর্কের নিশ্চয়তা বা সম্ভাবনা না থাকলে তারা খুব একটা স্বাস্থ্যগত উন্নতি বা তৃপ্তি খুঁজে পান না। অর্থাৎ সম্পর্কের একটি সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ বা প্রতিশ্রুতিই নারীর সুস্বাস্থ্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
বয়সের ব্যবধানের প্রভাব
‘রিলেশনশিপ থেরাপি’ জার্নালে প্রকাশিত এক লেখায় আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, যেসব নারী বয়সে ছোট পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন, তারা তুলনামূলক বেশি সুখী। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নারীদের ওপর করা এই জরিপ বলছে, বয়সে ছোট সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কে থাকলে নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। তারা নিজেদের ওপর বেশি আস্থা পান। এছাড়া তাদের মানসিক বুদ্ধিমত্তা বেশি ভালো থাকে। অর্থাৎ তারা নিজেদের আবেগ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন থাকেন। এ ধরনের সম্পর্কে নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বেশি থাকে। প্রথাগত লিঙ্গীয় ভূমিকার বাইরে গিয়ে তারা অনেক বেশি খোলামেলা সম্পর্ক উপভোগ করেন, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ থাকে। যদিও সমাজ এখনো বয়সে ছোট সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক তকমা ব্যবহার করে। তবুও পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ ধরনের সম্পর্কের রসায়ন ও গভীরতা অনেক সময় সমবয়সী সম্পর্কের চেয়েও বেশি হয়।
সম্পর্কের আসল শক্তি কোথায়?
গবেষণাগুলোর মধ্যে উঠে এসেছে ভালোবাসা বা সুখ কিংবা সন্তুষ্টি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা প্রথাগত ছকে বাঁধা নয়। সুখ আসলে লুকিয়ে থাকে সম্পর্কের গুণগত মানের ওপর। যেমন, পরিকল্পনার আনন্দ। বিয়ের চেয়েও বড় আনন্দ হল সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা। বিয়ের আগে ব্যক্তিগত সত্তা বজায় থাকে বেশি। বিয়ের পর যখন সামাজিক দায়িত্ব বা প্রত্যাশার চাপে নিজের সত্তা হারিয়ে যায়, তখনই সুখ বা সন্তুষ্টি কমতে থাকে। বয়সের ব্যবধান যা-ই হোক না কেন, যেখানে একজন নারী নিজেকে প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও গুরুত্ব পান, সেখানেই প্রকৃত সুখ ও সন্তুষ্টি স্থায়ী হয়।
বিপি>টিডি
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি