বিশ্ব কফি দিবস আজ: কফির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অজানা গল্প
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: সকালের ঘুমঘুম চোখে এক কাপ গরম কফি। ব্যস্ত দিনের মাঝখানে একটু বিরতি নিয়ে কফির কাপে চুমুক। পুরনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, ব্যাবসায়িক বৈঠক কিংবা নতুন কারও সঙ্গে প্রথম দেখা—কফি যেন নানা মুহূর্তের নীরব সঙ্গী।এসপ্রেসো, ক্যাপুচিনো, মোচা, ডিক্যাফ কিংবা ফিল্টার কফি—পছন্দের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কফিকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা বিশ্বজুড়েই পরিচিত। সেই ভালোবাসা উদ্যাপনেই প্রতিবছর ১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কফি দিবস। আন্তর্জাতিক কফি সংস্থা ২০১৫ সালে দিবসটি চালু করে।
দিনটি শুধু এক কাপ কফির স্বাদ উপভোগের উপলক্ষ নয়; কফির দীর্ঘ ইতিহাস, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষ এবং কফি উৎপাদনের সামাজিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি করে।
কফির ইতিহাসের শুরুটা নিশ্চিত তথ্যের চেয়ে কিংবদন্তিতেই বেশি মোড়া। প্রচলিত একটি গল্প অনুযায়ী, নবম শতকে ইথিওপিয়ার এক ছাগলপালক ছিলেন কালদি। তিনি লক্ষ করেন, একটি বিশেষ গাছের ফল খাওয়ার পর তার ছাগলগুলো অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে এবং রাতে ঘুমাতেও চাইছে না।
কালদি বিষয়টি স্থানীয় এক মঠের ধর্মগুরুকে জানান। দীর্ঘ সময়ের প্রার্থনার সময় জেগে থাকতে সমস্যায় পড়া সেই ধর্মগুরু কফির ফল দিয়ে পানীয় তৈরি করেন। গল্প অনুযায়ী, পানীয়টি তাকে সতর্ক ও জেগে থাকতে সাহায্য করে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কফির চাঙা করে দেওয়ার বৈশিষ্ট্যের কথা ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত নয়।কফির প্রকৃত আবিষ্কারক কে, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যও নেই। তবু কালদির গল্প কফির ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত কিংবদন্তিগুলোর একটি হয়ে আছে।কফির বাণিজ্যিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় আরব উপদ্বীপে। ১৫ শতকের মধ্যে বর্তমান ইয়েমেনে কফির চাষ শুরু হয়। পরবর্তী শতকে ইরান, মিসর, সিরিয়া ও তুরস্কসহ আশপাশের অঞ্চলেও কফি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন কফি শুধু ঘরে বসে পান করার পানীয় ছিল না। শহরগুলোতে গড়ে উঠতে থাকে কফিঘর, যেগুলো পরিচিত ছিল ‘কাহভেহ খানেহ’ নামে। সেখানে মানুষ কফি পান করার পাশাপাশি গান শুনত, বিভিন্ন পরিবেশনা দেখত, দাবা খেলত এবং সাম্প্রতিক খবর নিয়ে আলোচনা করত। অর্থাৎ কফিঘর হয়ে উঠেছিল সামাজিক যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের জায়গা। এসব স্থানকে তাই ‘জ্ঞানীদের বিদ্যালয়’ বলেও অভিহিত করা হতো। শত শত বছর পর আধুনিক ক্যাফেতে বসে ল্যাপটপ খুলে কাজ করা, বই পড়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার দৃশ্যের মধ্যে যেন সেই পুরোনো কফিঘরেরই নতুন সংস্করণ দেখা যায়।
১৭ শতকে কফি ইউরোপে পৌঁছায়। প্রথম দিকে অবশ্য সবাই পানীয়টিকে স্বাগত জানায়নি। কোথাও কোথাও কফিকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এমনকি কেউ কেউ একে ‘শয়তানের তিক্ত আবিষ্কার’ বলেও আখ্যা দিয়েছিল। ১৬১৫ সালে কফি ভেনিসে পৌঁছানোর পর স্থানীয় ধর্মযাজকদের মধ্যেও আপত্তি দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি পোপ অষ্টম ক্লিমেন্টের কাছে যায়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি নিজে কফি পান করে এর স্বাদ পছন্দ করেন এবং পানীয়টির অনুমোদন দেন। এরপর ইউরোপের বিভিন্ন শহরে দ্রুত কফিঘর ছড়িয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের কফিঘরগুলোকে বলা হতো ‘এক পয়সার বিশ্ববিদ্যালয়’। কারণ, অল্প খরচে সেখানে কফির পাশাপাশি নানা বিষয়ে আলোচনা ও তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল।
কফিঘর শুধু সামাজিকতার জায়গা ছিল না; ব্যবসা ও বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ১৭ শতকের মাঝামাঝি লন্ডনেই ৩০০টির বেশি কফিঘর ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব কফিঘরের কোনোটি ব্যবসায়ীদের, কোনোটি শিল্পীদের আবার কোনোটি শেয়ার ব্যবসায়ীদের আকর্ষণ করত। এমনকি বিশ্বের অন্যতম বড় বীমা বাজার লয়েডস অব লন্ডনের শুরুর ইতিহাসও একটি কফিঘরের সঙ্গে যুক্ত। এডওয়ার্ড লয়েডের কফিঘরকে কেন্দ্র করেই এর সূচনা হয়েছিল। কফির জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরব উপদ্বীপের বাইরে কফি উৎপাদনের প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়। ডাচরা ১৭ শতকের শেষ দিকে কফিগাছের চারা সংগ্রহ করে। ভারতে তাদের প্রাথমিক চেষ্টা সফল না হলেও বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে কফি চাষ সফল হয়।
পরে সুমাত্রা ও সুলাওয়েসিতেও কফি উৎপাদন ছড়িয়ে পড়ে। আরবের কফি ও জাভার কফির মিশ্রণ থেকে তৈরি হয় মোচা জাভা—কফির জগতে আজও পরিচিত একটি মিশ্রণ। অন্যদিকে, ফরাসি ধর্মপ্রচারকেরা ১৯ শতকে ভিয়েতনামে কফিগাছ নিয়ে যান। আর ক্যারিবীয় অঞ্চল ও আমেরিকায় কফি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফ্রান্স থেকে নেওয়া একটি কফিচারা। ১৭২৩ সালে গ্যাব্রিয়েল দ্য ক্লিউ নামের এক ফরাসি নৌ কর্মকর্তা সেই চারা মার্টিনিকে নিয়ে যান বলে প্রচলিত আছে। কঠিন আবহাওয়া, জলদস্যুর আক্রমণ এবং নানা বিপদের মধ্যেও চারাটি তিনি বাঁচিয়ে রাখেন। পরবর্তী ৫০ বছরে শুধু মার্টিনিকেই বিপুলসংখ্যক কফিগাছ জন্ম নেয়। ব্রাজিলেও কফির প্রবেশের গল্প কম নাটকীয় নয়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ফরাসি গায়ানা থেকে কফির বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে ফ্রান্সিসকো দে মেলো পালহেতা এক বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নেন। ফরাসি গভর্নরের স্ত্রী তাকে বিদায়ের সময় একটি ফুলের তোড়া দেন, যার ভেতরে লুকানো ছিল কফির বীজ। সেই বীজ থেকেই পরে ব্রাজিলের বিশাল কফি শিল্পের ভিত্তি তৈরি হয় বলে গল্পটি প্রচলিত। ১৮ ও ১৯ শতকে কফির চাষ ও বাণিজ্য দ্রুত বিস্তৃত হয়। ধর্মপ্রচারক, ব্যবসায়ী, উপনিবেশ স্থাপনকারী ও ভ্রমণকারীদের হাত ধরে কফি পৌঁছে যায় বিশ্বের নানা প্রান্তে। ১৯ শতকের শুরুতে কফি বিশ্বের অন্যতম লাভজনক রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়। দুর্গম পাহাড় থেকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন—বিভিন্ন পরিবেশে শুরু হয় কফির চাষ। কোথাও সাফল্য আসে, কোথাও ফসল নষ্ট হয়। কফির অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে কারও সম্পদ বাড়ে, আবার কেউ ক্ষতির মুখে পড়ে। কফি তখন আর কেবল একটি পানীয় নয়; হয়ে ওঠে একটি বৈশ্বিক পণ্য।
শিল্পায়নের সঙ্গে কফির ব্যাপক উৎপাদন ও সহজলভ্যতা বাড়ে। মুদি দোকানের তাকজুড়ে জায়গা করে নেয় আগে থেকে গুঁড়া করা কফি। এই পর্যায়ে কফির স্বাদ বা উৎপত্তির চেয়ে সহজে পাওয়া ও দ্রুত তৈরি করাই ছিল বড় বিষয়। এরপর আসে কফিশপ ও বড় ব্র্যান্ডের বিস্তার। কফি পানের সঙ্গে যুক্ত হয় অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও সামাজিকতার নতুন মাত্রা। আর সাম্প্রতিক সময়ে কফি নিয়ে মানুষের আগ্রহ আরো সূক্ষ্ম হয়েছে। বিশেষ মানের কফি, নির্দিষ্ট অঞ্চল বা একক উৎসের কফি, বিভিন্ন মাত্রায় রোস্ট করা বীজ এবং হাতে তৈরি নানা পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফ্রেঞ্চ প্রেস থেকে শুরু করে ওপর থেকে পানি ঢেলে কফি তৈরির পদ্ধতি—কফি যেন নিজেই একটি অনুসন্ধানের বিষয়। এখন কফিপ্রেমীরা শুধু ‘কফি’ চান না; তারা জানতে চান কফিটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে, কীভাবে রোস্ট করা হয়েছে এবং কীভাবে কাপ পর্যন্ত পৌঁছেছে।বিশ্ব কফি দিবসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি এখানেই। এক কাপ কফি শুধু ক্যাফের কাউন্টার থেকে শুরু হয় না। এর পেছনে থাকেন কফি চাষি, বাগানের শ্রমিক, প্রক্রিয়াজাতকারী, রপ্তানিকারক, আমদানিকারক, রোস্টার, বারিস্তা এবং অসংখ্য মানুষের শ্রম। কফির সঙ্গে তাই ন্যায্য বাণিজ্য, কৃষকের জীবনযাত্রা, কাজের পরিবেশ এবং পরিবেশগত দায়িত্বশীলতার বিষয়গুলোও জড়িয়ে আছে। কফির উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা এবং উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার আলোচনা দিন দিন গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে কফি শিল্পে নারীদের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। ‘উইমেন ইন কফি’ ধরনের নেটওয়ার্ক কফির সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করা নারীদের সহায়তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়।
কফির দীর্ঘ যাত্রায় বদলেছে স্বাদ, তৈরির পদ্ধতি ও পরিবেশন। কিন্তু বদলায়নি মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ তৈরিতে এর ভূমিকা। একসময় আরবের কাহভেহ খানেহ ছিল আলোচনা ও তথ্যের কেন্দ্র। পরে ইউরোপের কফিঘর হয়ে উঠেছিল ব্যবসা ও মতবিনিময়ের জায়গা। আর আজকের ক্যাফেতে মানুষ কাজ করে, বই পড়ে, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে কিংবা নিঃশব্দে নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে নেয়। তাই ১ অক্টোবরের বিশ্ব কফি দিবস কেবল কফির কাপে চুমুক দেওয়ার দিন নয়। এটি সেই দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর দিন, যে ইতিহাস ইথিওপিয়ার পাহাড় থেকে শুরু হয়ে আরব উপদ্বীপ, ইউরোপ, এশিয়া, আমেরিকা পেরিয়ে আজকের আধুনিক ক্যাফেতে এসে পৌঁছেছে।পরেরবার এক কাপ কফি হাতে নিলে হয়তো এক মুহূর্তের জন্য মনে পড়তে পারে—এই ছোট্ট কাপটির ভেতরে রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস, অসংখ্য মানুষের শ্রম, নানা সংস্কৃতির মেলবন্ধন আর পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এক অদ্ভুত পানীয়ের গল্প। কফির কাপে তাই শুধু ক্যাফেইন নয়, মিশে থাকে মানুষের গল্পও।
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি