বেবী নাজনীন বাদ, 'ফাতেমা' তারেক জিয়ার আইনত বোন
নোমান সাবিত: বেবী নাজনীন বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ নামে পরিচিত এ শিল্পী দীর্ঘদিন ধরেই শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরেও আলোচিত একটি নাম। সম্প্রতি তাঁকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের আইনি অবস্থান নিয়ে।
বেবী নাজনীন নব্বইয়ের দশকে আধুনিক বাংলা গানের জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর কণ্ঠ, স্টেজ উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক আনুগত্য সব মিলিয়ে তিনি বিএনপি-সমর্থিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেন।
তিনি প্রকাশ্যেই বহুবার বলেছেন, শৈশব থেকেই তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-কে ‘বাবা’ এবং খালেদা জিয়াকে ‘মা’ বলে ডাকতেন। এই আবেগঘন সম্পর্কের ভিত্তিতেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে তাঁকে পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হতো।
বেবী নাজনীন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে তিনি খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক জিয়ার ‘ধর্মত/আইনত বোন’। এ নিয়ে তিনি অনেক মঞ্চে গানও গেয়েছেন 'খালেদা আমার মা, তারেক আমার ভাই' শিরোনামে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, তারেক জিয়া তাঁর মায়ের দীর্ঘদিনের গৃহপরিচারিকা ফাতেমাকে আইনগতভাবে ‘বোন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এর ফলে বেবী নাজনীনের সেই দাবি বা সামাজিক স্বীকৃতি কার্যত বাতিল বা প্রত্যাহৃত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বহু বছর ধরে বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে পরিচিত। অসুস্থতা, কারাবাস ও রাজনৈতিক সংকটের সময় ফাতেমা তাঁর নিকটতম সহচর হিসেবে ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। সেই দীর্ঘ নির্ভরতা ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটেই ফাতেমাকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
দলের একাধিক নেতাকর্মী জানান, বেবী নাজনীন স্কুলজীবন থেকে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। দীর্ঘ আট বছরের প্রবাস জীবন শেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরেন। এরপর থেকেই তিনি দলে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।কণ্ঠশিল্পী বেবী বেবী নাজনীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। সৈয়দপুরে তার জন্মস্থান। তবে চূড়ান্ত তালিকায় এ আসনে সৈয়দপুর সাংগঠনিক জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকারের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে প্রাথমিক তালিকায় নাম না থাকায় বেবী নাজনীন সমর্থকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের আগে তিনি সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জে ব্যাপক জনসংযোগ, পথসভা ও মতবিনিময় সভা করে আসছিলেন, যেখানে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
এছাড়া ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেবী নাজনীন একই আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। সে সময় তাকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত সৈয়দপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন সরকারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে বেবী নাজনীন নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। দল তাকে এ আসন থেকে মনোনয়ন দিলে জয়ের সম্ভাবনা ছিল।
বেবি নাজনীন বহু জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। আধুনিক সংগীতের সর্বাধিক সংখ্যক একক, দ্বৈত ও মিশ্র অডিও অ্যালবামের শিল্পী বেবী নাজনীন তার সংগীত জীবনের শুরু থেকেই অডিও মাধ্যম, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং দেশ-বিদেশের মঞ্চ মাধ্যম মাতিয়েছেন সমান তালে। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে বাংলা গানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছেন উত্তরবঙ্গের দোয়েল খ্যাত এই সঙ্গীত তারকা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে পরিবার নিয়ে বাস করতেন বেবী নাজনীন। এখন একমাত্র ছেলে মহারাজ অমিতাভকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের এস্টোরিয়াতে আছেন। ছেলে ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টোন থেকে আইটি নিয়ে স্নাতক শেষ করেছেন। ইন্টার্ন করছেন।
এই সিদ্ধান্ত বেবী নাজনীনকে মানসিকভাবে আঘাত করেছে বলেই মনে করছেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা। যদিও এ বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে ক্ষোভ ও হতাশার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
অনেকের মতে, এটি কেবল একটি পারিবারিক বা আইনি সিদ্ধান্ত নয় বরং বিএনপির অভ্যন্তরীণ আস্থা, আনুগত্য ও দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়নের প্রতিফলন।
বেবী নাজনীনের ‘আইনত বা ধর্মত বোন’ হিসেবে অবস্থান হারানো রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। এটি দেখায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আবেগ, দীর্ঘদিনের আনুগত্য কিংবা সাংস্কৃতিক অবদানও শেষ পর্যন্ত আইনি সিদ্ধান্তের কাছে গৌণ হয়ে যেতে পারে।
এই ঘটনাকে কেউ কেউ পারিবারিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ দেখছেন রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির সূক্ষ্ম বার্তা হিসেবে।
বেবী নাজনীন ও খালেদা জিয়ার সম্পর্ক একসময় আবেগ, আনুগত্য ও বিশ্বাসের প্রতীক ছিল। সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত সেই সম্পর্কের আইনি অধ্যায়ে স্পষ্ট এক ছেদ টেনেছে। তবে ইতিহাস, স্মৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সম্পর্কের প্রভাব পুরোপুরি মুছে যাবে কি না তা সময়ই বলে দেবে।
একটি বিষয় নিশ্চিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্পর্ক শুধু হৃদয়ের নয়, কাগজের ভাষাতেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান
দেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার হয়েছে: ডা. জুবাইদা রহমান
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি