আমি যদি প্রধান উপদেষ্টা হতাম, পদত্যাগ করতাম
ছাবেদ সাথী
বাংলাদেশ আজ কেবল অস্থির নয়, বাংলাদেশ আজ দিশাহারা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাজনীতির নৈতিকতা, প্রশাসনের সক্ষমতা এবং আসন্ন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা সবকিছু একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে। যুবনেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর যে সহিংস বিস্ফোরণ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তা কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়া নয়, এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তৃত্ব আর জনআস্থার ভিত একসঙ্গে কাঁপছে। যুবনেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যে সহিংস বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ল তা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই নগ্ন প্রকাশ।
৩২ বছর বয়সী হাদি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চ–এর মুখপাত্র।একটি প্ল্যাটফর্ম, যা নিজেকে 'উত্থানের চেতনায় অনুপ্রাণিত বিপ্লবী সাংস্কৃতিক উদ্যোগ' বলে দাবি করে। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতেই ঢাকার রাস্তায় মুখোশধারীদের গুলিতে তিনি লুটিয়ে পড়েন। উন্নত চিকিৎসার আশায় সিঙ্গাপুর তারপর ছয় দিন লাইফ সাপোর্ট শেষ পর্যন্ত মৃত্যু। এই মৃত্যু কেবল একজন নেতার নয়, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর এক নির্মম রায়।
হাদির পরিচিত অবস্থান ছিল ভারতের কড়া সমালোচক হিসেবে। ফলে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষোভের ভাষা হয়ে উঠল আরও তীব্র, আরও আবেগপ্রবণ। ঢাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেল প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার–এর কার্যালয়ে ভাঙচুর, আগুন, আতঙ্ক। সেনা মোতায়েন, ফায়ার সার্ভিসের দৌড়ঝাঁপ, আটকে পড়া সাংবাদিকদের উদ্ধার সব মিলিয়ে দৃশ্যপটটি ছিল রাষ্ট্রের ব্যর্থতার লাইভ সম্প্রচার।
এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট। ছাত্রনেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আসে। সংস্কার বিলম্বিত, নির্বাচন সামনে, ভোটে অংশ নিতে না পারা একটি বড় দলের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র ছিল আগেই টানটান। হাদির মৃত্যু সেই টানটান তারে আগুন ধরিয়ে দিল।
প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণে শান্ত থাকার আহ্বান জানালেন, স্বচ্ছ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিলেন। রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা হলো। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়—রাষ্ট্র কি কেবল শোক আর আশ্বাসেই দায় সারে? যখন রাজপথে বুলডোজার নামিয়ে দলীয় কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যখন সড়ক অবরোধে জনজীবন স্তব্ধ হয়, যখন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগে তখন কেবল 'শান্ত থাকুন' বললেই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ?
এখানেই আমার অবস্থান স্পষ্ট: আমি যদি প্রধান উপদেষ্টা হতাম, পদত্যাগ করতাম
পদত্যাগ পালানো নয়, পদত্যাগ কখনো কখনো দায় স্বীকারের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ভাষা। যখন রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়; যখন নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না; যখন তদন্তের আগেই জনতা রায় দিয়ে দেয় তখন ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা নৈতিক নয়। দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ হলো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, না পারলে জায়গা ছেড়ে দেওয়া। যখন রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, যখন নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, যখন আস্থার সংকট গভীর হয় তখন ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা নেতৃত্ব নয়, বরং সমস্যা।
আজ বাংলাদেশে যে সহিংসতা, তা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি আস্থার সংকট। প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান–এর বাড়িতে বারবার আগুন লাগা, প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট–এ ভাঙচুর—এসব প্রতীকী হামলা। এগুলো বলে দেয়, রাষ্ট্রের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম সবই আজ রাগের লক্ষ্যবস্তু।
নির্বাচন আসছে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন মানে শুধু ব্যালট বাক্স নয়; মানে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও আস্থা। হাদির হত্যার বিচার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ না হলে শোকের পতাকা নামবে, কিন্তু ক্ষোভ নামবে না।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে দরকার সাহসী সিদ্ধান্ত। ক্ষমতা ধরে রাখা নয়—দায়িত্বের ভার নেওয়া। আর সেই ভার যদি বহন করা না যায়, তবে সরে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রনায়কোচিত কাজ।
রাজপথে প্রতিশোধ, রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি
হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকাসহ একাধিক শহরে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষুব্ধ জনতা দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার–এর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। সাংবাদিকেরা আটকে পড়েন, সেনা মোতায়েন করা হয়, ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
এটি শুধু সংবাদমাধ্যমে হামলা নয়, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। গণমাধ্যমকে শত্রু বানানোর এই প্রবণতা রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর ইঙ্গিত বহন করে। একইসঙ্গে ঢাকায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট–এ ভাঙচুর, রাজশাহীতে বুলডোজার দিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া, বিভিন্ন জেলায় সড়ক অবরোধ সব মিলিয়ে রাষ্ট্র যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের চাপ ও সীমাবদ্ধতা
ছাত্রনেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। এই সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একটি নিরপেক্ষ, নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরি করার জন্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো সংস্কার প্রক্রিয়া ধীর, রাজনৈতিক ঐকমত্য দুর্বল, প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নবিদ্ধ।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশ এমনিতেই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। তার ওপর একজন সক্রিয় প্রার্থীর প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে বিস্ফোরণোন্মুখ করে তোলে। হাদির মৃত্যুর পর জাতির উদ্দেশে ভাষণে ইউনূস শান্ত থাকার আহ্বান জানান, স্বচ্ছ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন এবং সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে সতর্ক করেন। সরকার শনিবার রাষ্ট্রীয় শোকও ঘোষণা করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—শোক আর বিবৃতিই কি যথেষ্ট?
রাষ্ট্র যখন নাগরিককে রক্ষা করতে পারে না
যখন একজন রাজনৈতিক কর্মী প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হন, যখন হত্যার পরও সন্দেহভাজনদের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য আসে না, যখন জনগণ রাস্তায় নেমে নিজেরাই বিচার করতে উদ্যত হয় তখন রাষ্ট্র কার্যত ব্যর্থ। এই ব্যর্থতার দায় কার?
এখানেই আমার অবস্থান পরিষ্কার: আমি যদি প্রধান উপদেষ্টা হতাম, পদত্যাগ করতাম।
নির্বাচন, নাকি অনিশ্চয়তার উৎসব?
বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা দিয়ে হয় না। হয় আস্থা দিয়ে, হয় ন্যায়বিচার দিয়ে, হয় রাজনৈতিক সহনশীলতা দিয়ে। আজ বাংলাদেশে সেই ভিত্তিগুলো নড়বড়ে। প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান–এর বাড়িতে বারবার হামলা, রাষ্ট্রীয় প্রতীক ধ্বংস—এসব কেবল ভাঙচুর নয়, ইতিহাস ও রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ।
যদি হাদির হত্যার বিচার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ না হয়, তবে এই ক্ষোভ আরও ছড়াবে। তখন নির্বাচন হবে না গণতন্ত্রের উৎসব, বরং অনিশ্চয়তার উৎস।
শেষ কথা
বাংলাদেশ আজ এমন এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে সাহসী সিদ্ধান্ত ছাড়া সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা জরুরি। আর যদি সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা না থাকে, তবে সরে দাঁড়ানোই রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত।
কারণ ইতিহাস ক্ষমতায় থাকার হিসাব রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে, কে দায়িত্বের ভার বইতে পেরেছিল, আর কে পারেনি।
(*এই প্রতিবেদনটি বাংলা প্রেসের তৈরি। অনুমতি ছাড়া আমাদের বিষয়বস্তু, ছবি বা সম্প্রচার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ)।
ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।
বিপি/এসএম
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন
সঙ্গীত একাডেমি