১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০ মাসে আমেরিকাকে কীভাবে বিপর্যস্ত করা যায়

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১১ পিএম
২০ মাসে আমেরিকাকে কীভাবে বিপর্যস্ত করা যায়

২০ মাসে আমেরিকাকে কীভাবে বিপর্যস্ত করা যায়

ছাবেদ সাথী

নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার ২৫তম বার্ষিকী যখন আর মাত্র কয়েক দিন দূরে, তখন ওসামা বিন লাদেনের পাশাপাশি অ্যাডলফ হিটলার, ভ্লাদিমির লেনিন ও জোসেফ স্টালিন হয়তো কবরে শুয়েও বিস্মিত হতেন। আমেরিকাকে পরাজিত করার তাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ মাত্র ২০ মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শত্রুর চেয়েও দেশটির বেশি ক্ষতি করেছেন—এমনটাই লেখকের অভিমত। নিজেকে “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মার্কিন প্রেসিডেন্ট” হিসেবে বর্ণনা করলেও লেখকের মতে বাস্তবতা তার বিপরীত।

ট্রাম্পের সমর্থকেরা তাঁর বিভিন্ন পদক্ষেপকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবেন। এটা সত্য যে, ট্রাম্প অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীমান্তে অনিয়মিত প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছেন। প্রথম মেয়াদে তিনি আব্রাহাম অ্যাকর্ডস প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের জটিল কিছু সমস্যা সমাধানের পথে অন্তত কিছুটা অগ্রগতি এনেছিল। কিন্তু লেখকের মতে, তাঁর নীতির কারণে সৃষ্ট ক্ষতির দিকগুলোও বিবেচনা করা দরকার।

লেখক অভিযোগ করেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে দুর্বল করেছেন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ ও অনুচ্ছেদ ৪-এ বর্ণিত কংগ্রেস ও বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্ট মাঝেমধ্যে প্রেসিডেন্টের কিছু পদক্ষেপে বাধা দিলেও লেখকের মতে সেটি ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প এ পর্যন্ত ২৭৯টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। আদালত শুল্কসংক্রান্ত একটি পদক্ষেপ অসাংবিধানিক বলে রায় দেওয়ার পরও প্রশাসন অন্য আইনি পথ ব্যবহার করেছে বলে লেখক দাবি করেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিরও ক্ষতি করছে এবং ২০২৬ সালে একটি মার্কিন পরিবারের বার্ষিক ব্যয় গড়ে প্রায় ১,৩০০ ডলার বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধও তীব্র হয়েছে।

সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিধান থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এর প্রয়োগ সীমিত করার চেষ্টা করছেন বলে লেখক উল্লেখ করেন। হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ভেঙে বলরুম নির্মাণের বিষয়টিও তিনি সমালোচনা করেছেন। প্রকল্পটি বেসরকারি দাতাদের অর্থে নির্মিত হবে বলে প্রথমে জানানো হলেও পরে সরকার নির্মাণ ব্যয়ের একটি অংশ বহন করবে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় পক্ষের মধ্যেই দূরত্ব এবং বৈরিতা অনেক বেড়েছে বলে লেখক মনে করেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সমান অংশীদার হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা বেড়েছে। গৃহযুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ সম্ভবত আর কখনো এতটা বিভক্ত ছিল না—এমন তুলনাও তিনি টেনেছেন।

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি তাঁর ও তাঁর পরিবারের আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে মিশে গেছে বলেও লেখক অভিযোগ করেন। বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ট্রাম্পের সম্পদ কয়েক বিলিয়ন ডলার বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ট্রাম্পের ছেলে ও জামাতার ব্যবসায় সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল অর্থ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে পেন্টাগনের চুক্তিসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়েও লেখক প্রশ্ন তুলেছেন।

পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রেও ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রায় ৮০ বছরের মার্কিন নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছেন বলে লেখকের অভিমত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি, জাপান ও ইউরোপ পুনর্গঠনে সহায়তা করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা ও সুযোগের প্রতীক হিসেবে যে আন্তর্জাতিক ভূমিকা গড়ে তুলেছিল, সেটি তাঁর মতে এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র, বন্ধু ও অংশীদারদের ওপর নির্ভর করেছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ন্যাটো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক জোট হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য ন্যাটো সদস্যদের ওপর ট্রাম্পের চাপ ও হুমকি এবং ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার বা পুনর্বিন্যাস জোটটির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে বলে লেখক মনে করেন। গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবিকেও তিনি কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন।

লেখকের মতে, এসব নীতির পাশাপাশি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থান ন্যাটোকে দুর্বল করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে তাঁর আচরণ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন সহায়তা কমিয়ে ইউরোপকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে বাধ্য করার নীতি রাশিয়াকে সুবিধা দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

একইভাবে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা দক্ষিণ কোরিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবশেষে লেখক মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার কঠোর সমালোচনা করেছেন। নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন এক জটিল সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন। ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিনি—এমন জরিপের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দেওয়া বিভ্রান্তিকর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়েছে—এমন অভিযোগও লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ও শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই সংঘাতের পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।

তাঁর মতে, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হতে পারে যে ভবিষ্যতে তুলনামূলক বিচারে ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধকেও সফল বলে মনে হতে পারে।

ছাবেদ সাথী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস। 

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি